ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনের প্রভুত্ব বিস্তারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা দমন করবে

For Sharing

ভারত-মার্কিন কৌশলগত অংশীদারিত্ব বিগত দুই দশকে ক্রমাগত সম্প্রসারিত ও মজবুত হয়ে উঠেছে। তবে এই অংশীদারিত্ব এখন প্রকৃত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, বিশেষ করে, ভারত-চীন সীমান্তের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় বেইজিঙয়ের সাম্প্রতিক আগ্রাসনমূলক আচরণের প্রেক্ষিতে।

কেবল আমেরিকাই নয়, বেশ কিছু দেশের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত অংশীদারিত্ব বিদ্যমান। তবে এ পর্যন্ত আমেরিকাই সবচেয়ে বেশি এই সময়ে ভারতের প্রতি খোলাখুলি সমর্থন জানাচ্ছে। শুধু তাই নয়, ওয়াশিংটন, বেশ কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে, যাতে চীন খানিকটা ভয় পেয়ে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা অঞ্চল থেকে তার সেনা সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন দিল্লির কোনো সামরিক আঁতাত বা জোট হতে চলেছে। প্রকৃত অর্থে আমেরিকা বা ভারত কেউই চীন বিরোধী যে কোনো ধরণের আঁতাত কোরতে আগ্রহী নয়।

তবে কৌশলগত অংশিদারিত্বের প্রকৃত আদর্শের ওপর ভিত্তি কোরে হোয়াইট হাউসের কিছু বলিষ্ঠ ঘোষণা ও দক্ষিণ চীন সাগরে পেন্টাগনের দুটি বিমানবাহী জাহাজ প্রেরণের সাথে সাথে LAC’তে চীনা সেনাকে ভারতের যোগ্য সামরিক জবাব, চীনকে তার যে কোনো অনৈতিক বা বেআইনি কাজ করা থেকে বিরত রাখতে নিঃসন্দেহে ভূমিকা পালন করেছে।

LAC’তে ভারতের সামরিক শক্তির আরও প্রমাণ পাওয়া গেল, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারত-চীন সীমান্তের অগ্রবর্তী সামরিক ঘাঁটি পরিদর্শনে। তিনি হঠাৎই সেখানে গিয়ে কেবল যে সেনা দলের মনোবল বাড়ালেন, তাই নয়, চীনকে তার দুঃসাহসের বিরুদ্ধে এক সুস্পষ্ট ইঙ্গিতও দিলেন। আর প্রধানমন্ত্রীর এই কাজের পরিপূরক হিসেবে কাজ করল, একদা পররাষ্ট্র সচিব, ঝানু কূটনীতিবিদ তথা বর্তমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডঃ সুব্রামনিয়াম জয়শংকরের  অত্যন্ত দক্ষতাপূর্ণ  নেতৃত্ব, যিনি মারণ কোভিড-১৯ অতিমারির বর্তমান সময়ে চীনা আগ্রাসন বানচাল কোরতে অসাধারণ কূটনৈতিক দক্ষতার পরিচয় দিলেন।

ইতিহাস বলে, একটি দেশ যখন নিজেই তার সীমান্ত রক্ষায় উপযুক্ত ক্ষমতার পরিচয় দেয়, তখনই বাইরের শক্তিও তার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। বর্তমানে এটাই ঘটল। কেবল আমেরিকাই নয় , ফ্রান্স, ইউরোপীয় সঙ্ঘ, জার্মানি, আশিয়ান দেশ গোষ্ঠী, বিশ্বে চীনের প্রভুত্ব বিস্তারের তথাকথিত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট মতামত ব্যক্ত করল ও নতুন দিল্লির পাশে দাঁড়ালো।

কোভিড-১৯ অতিমারি জনিত বিপদের সুযোগ নিয়ে বেইজিং, কি স্থলে কি জলে, অন্য দেশের ভূখণ্ড হড়পের অভিসন্ধি জাহির করল। অন্য দিকে সে, এই অতিমারি সাফল্যের সঙ্গে  নিয়ন্ত্রণ কোরে দেশের অর্থব্যবস্থাকে আবার আগের জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছে বলে ঘোষণা কোরে বাকি  বিশ্বের সঙ্গে চরম প্রতারণা করল। আসলে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে চীন বিশ্বের মধ্যে যে একটি পরাশক্তি  হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে, তা এখন আন্তর্জাতিক মহলের কাছে জলের মত পরিষ্কার।

চীনের এই আচরণে সে দেশের শান্তিপূর্ণ উত্থানের মতবাদ ভ্রান্ত ও প্রতারণাপূর্ণ বলেই প্রমাণিত হচ্ছে। আসলে এই দেশ তার এই  মতবাদকে কাজে লাগিয়ে প্রচ্ছন্নভাবে বহু দিন থেকেই ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্ঠা করে যাচ্ছে।

বিগত বছরগুলিতে চীন, আমেরিকার মিত্র ও কৌশলগত অংশীদার দেশগুলির সঙ্গে বৈরিতা সৃষ্টির নীতি  অনুসরণ করছে, যেমন হংকং, জাপান, ভিয়েতনাম, ভারত, ভুটান ও অস্ট্রেলিয়া।

এ সব সত্বেও, চীন তার এই অভিসন্ধিতে সফল হতে পারছে না। ভারত সীমান্ত থেকে তাকে সেনা সরিয়ে নিতে হল,  হংকং প্রশ্নে তার আচরণের বিরোধিতা করল আমেরিকা, ব্রিটেন ,অস্ট্রেলিয়া  ও অন্যান্য দেশ।  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই চীনকে শত্রু দেশ হিসেবে বর্ণনা করল। সমুদ্র সংক্রান্ত রাষ্ট্রসংঘ চুক্তির আওতায় আসিয়ান দেশগোষ্ঠী  দক্ষিণ চীন সাগর অঞ্চলে বিবাদ নিষ্পত্তির আবেদন জানাল। চীনকে, তার বেল্ট অ্যান্ড রোড যোজনার বিষয়েও নানা দেশ থেকে আপত্তির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

ঘটনাক্রম ধারাবাহিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, চীন যাতে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একটি শরিক দেশ হয়ে উঠতে পারে তার জন্য ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম থেকেই আশা করে আসছে। অনুমান করা হয়েছিল, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়িয়ে সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করা  যাবে; আর ওই দেশ তার অভ্যন্তরীণ নীতি ছাড়াও বিদেশ নীতিতে অধিক উদারপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করবে।

কিন্তু এই প্রত্যাশা এখন সব দিক থেকেই ভুল প্রমাণিত হল। এখন চীনকে আর নিজের শর্তে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ কোরতে দেওয়া অত্যন্ত মূখার্মি হবে বলেই বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমত।  (মূল রচনাঃ- চিন্তামণী মহাপাত্র )