ভারত-সিঙ্গাপুর সম্পর্ক

For Sharing

সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সেন লুং’এর নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন পিপল’স অ্যাকশান পার্টী( PAP) গত সপ্তাহে ২০২০’র সাধারণ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যায় জয়ী হয়ে ক্ষমতায় ফিরে এল। ৯৩ আসনের সিঙ্গাপুর সংসদে ৮৩ আসনে তাঁর দল জয়ী হয়ে, বলতে গেলে ইতিহাস রচনা করল। দেশের ৯৬ শতাংশ ভোটদাতা এই নির্বাচনে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ কোরে প্রমাণ করলেন, কোভিড অতিমারির ভয়াবহতাও দেশের মানুষের অদম্য মনোবলে এতটুকুও চিড় ধরাতে পারে নি। এই নির্বাচনে বিরোধী পক্ষ প্রায় তাদের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলল। বিরোধী ওয়ার্কার্স পার্টী মাত্র ১০ টি আসন ধরে রাখতে পারল। উল্লেখ করা যেতে পারে, ক্ষমতাসীন PAP সেই ১৯৫৯ সালে সিঙ্গাপুরে ক্ষমতায় আসবার পর থেকে পর পর নির্বাচনে জয়ী হয়ে  নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে সরকার পরিচালনা করে আসছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, সিংগাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সেন লুং’কে নির্বাচনে তাঁর জয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। দেশের এই সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে একই দলের সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় থাকায় ভারতের সঙ্গে ওই দেশের সম্পর্কের কেবল ধারাবাহিকতাই বজায় থাকল, তাই নয় এই সম্পর্ক ক্রমাগত মজবুত হয়ে ওঠার পথ সুগম হল।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বরাবরই সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা তথা ১৯৫৯ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দেশের প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন প্রয়াত লি কুয়ান ইউ’এর নেতৃত্বের প্রশংসক থেকেছেন। শ্রী মোদি ২০১৫’র মার্চ মাসে লি কুয়ান ইউ’এর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দেন। শ্রী মোদি সিঙ্গাপুরের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রীকে  এক দূরদৃষ্টি সম্পন্ন রাষ্ট্রনেতা ও বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ট নেতা হিসেবে তাঁর স্মৃতির উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শোক বার্তায় শ্রী মোদি সিঙ্গাপুরের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রীকে ভারতের প্রকৃত সুহৃদ বলে বর্ণনা কোরে বলেন, তিনি ভারতের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যুগপ্রাচীন সম্পর্ক ও ওই দেশগুলির সভ্যতার বিকাশে ভারতের গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকার কথা স্মরণ কোরে এই দেশগোষ্ঠী – ASEAN’এ ভারতের বৃহত্তর ভূমিকার পক্ষে জোরালো সমর্থন ব্যক্ত    করেছিলেন।

সিঙ্গাপুর ভারতের এক গুরুত্বপুর্ণ অংশীদার দেশ। ২০১৮’তে শাংগ্রিলা বার্তালাপে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর মূল ভাষণে সিঙ্গাপুরকে ASEAN’এর স্প্রিংবোর্ড হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি সিঙ্গাপুরকে ভারতের জন্য প্রাচ্যের তোরণ দ্বার হিসেবে  বর্ণনা করেন। সেই সম্মেলনে সেই প্রথম ভারত সরকারীভাবে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল সংক্রান্ত নীতি ব্যক্ত করে এবং এই নীতির মূল কেন্দ্রে রাখে ASEAN’কে।

২০২০ ভারত-সিঙ্গাপুর কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৫৫ তম বার্ষিকী; এবং ভারতের ‘পূবে তাকাও’ নীতির সূচনার পর থেকে দুটি দেশের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলিতে ধারাবাহিকভাবে সম্পর্কের উন্নতি ঘটছে। এরই ফলশ্রুতিতে ২০১৫’তে ভারত-সিঙ্গাপুর কৌশলগত অংশিদারিত্বের প্রতিষ্ঠা। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর ভারতের এক গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী দেশ। ২০১৮’তে স্বাক্ষরিত হয় দ্বিপাক্ষিক নৌ সহযোগিতা চুক্তি।

আসিয়ান দেশগুলির মধ্যে ভারতের আঞ্চলিক ও বৃহত্তর পররাষ্ট্র নীতিতে  সিঙ্গাপুর   এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। ২০১৪’র আগস্টে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ওই দেশ সফরে যান ও ৫-এস জোটের ওপর গুরুত্ব দেন, এ ছাড়া বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সংযোগ, স্মার্ট সিটি ও দক্ষতা উন্নয়ন সহ একাধিক ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধির দিশায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা করেন। ২০০৫ সালে দ্বিপাক্ষিক দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি সম্পাদনের পর থেকে ভারতে বিনিয়োগের এক গুরুত্বপূর্ণ দেশ হয়ে উঠেছে সিঙ্গাপুর। ২০১৯-২০ সালে দেশটি ভারতে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের সর্ববৃহৎ উৎস হয়েছে। শতকরা হিসাবে ভারতে মোট প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের ৩০ শতাংশ আসে ওই দেশ থেকে।

দুটি দেশের মধ্যে সহযোগিতার পরিধিও বিস্তৃত। দু দেশের শীর্ষ স্থানীয় নেতারা নিয়মিত সফর বিনিময় করে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৫ ও ১৮’এ সিঙ্গাপুর সফরে যান; অপরদিকে ওই দেশের প্রধানমন্ত্রী লি ২০১৬’তে নতুন দিল্লি সফরে আসেন ও ২০১৮’তে ভারত-আসিয়ান স্মারক শিখর সম্মেলনে অংশ নিতে ভারতে আসেন।

সিঙ্গাপুর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে, যেমন এশিয়া -প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা-APEC মঞ্চে ভারতের সদস্যপদের দাবিকে সমর্থন জানিয়েছে। এ ছাড়া দেশটি রাষ্ট্রসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের দাবীকে ধারাবাহিকভাবে সমর্থন জানিয়ে আসছে। দেশটি ভারত সমর্থিত ভারত- মহাসাগরীয় নৌ মহড়া-IONS বহুপাক্ষিক নৌ সহযোগিতায় সক্রিয় অংশগ্রহণকারী দেশ।

সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সেন লুং’এর নেতৃত্বাধীন পিপল’স অ্যাকশান পার্টী( PAP) ২০২০’র সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসায় ভারত ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে সম্পর্কে ক্রমাগত উন্নতি ঘটবে বলেই বিশ্বাস। এর ফলে দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছাড়াও জন সম্পর্ক ক্রমাগত মজবুত হয়ে ওঠার ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে। ( মূল রচনাঃ- সানা হাসমি)