ভারত-ইইউ পঞ্চদশ শিখর সম্মেলন – নতুন কৌশলগত দিশা নির্দেশিকা ২০২৫ গ্রহণ 

For Sharing

কোভিড অতিমারী পরিস্থিতির দরুন, পঞ্চদশ ভারত-ইইউ শিখর সম্মেলন  অনুষ্ঠিত হল ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে। উভয় পক্ষই তাদের মধ্যে একই ধরণের মূল্যবোধ, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধার ওপর গুরুত্ব দিয়ে একটি কার্যকর বহুপাক্ষিকতা এবং  রাষ্ট্রসংঘ ও ডাবলু টি ও’কে কেন্দ্র করে একটি বিধিসম্মত  বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতিবদ্ধতার কথা তুলে ধরে। তবে এই শিখর সম্মেলনে শুধু উভয়ের মধ্যে  সম্পর্কগুলির পর্যালোচনাই নয় , অতিমারির আর্থ-সামাজিক পরিণতির  প্রেক্ষাপটে ‘ইইউ-ভারত কৌশলগত অংশীদারিত্ব: ২০২৫এর লক্ষ্যে একটি দিশা  নির্দেশিকা’ গ্রহণ করা হয়েছে যা এই সম্পর্ককে আরও মজবুত করার পথ প্রশস্ত করেছে। যৌথ পদক্ষেপ গ্রহণের পরিধি প্রশস্ত ক’রে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র  মোদী এবং ইইউ পরিষদের সভাপতি চার্লস মিশেল ও কমিশনের প্রেসিডেন্ট মিসেস উরসুলা ভঁ ডের লেইন বর্তমান পরিস্থিতিতে কৌশলগত অংশীদারিত্বের  এই নতুন পথ নির্দেশিকাটি কার্যকর করার পন্থাপদ্ধতির বিষয়ে সহমত হয়েছেন।

উভয়পক্ষই গণস্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে বিশ্বব্যাপী সহযোগিতা এবং সংহতির উপর গুরুত্ব দেয় এবং যাতে বিশ্বের সবার জন্য মঙ্গলসাধক হিসেবে কোভিড ১৯ প্রতিষেধককে বিবেচনা করা হয় তার ওপরও জোর দেয়। উল্লেখ্য, ইইউ হল ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এবং বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি   ক্রমশঃ শক্তিশালী হয়ে ওঠা চীনের বিরুদ্ধে এর প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে।

বাণিজ্য প্রতিকূলতার মোকাবিলা এবং একটি নতুন উচ্চ পর্যায়ের বাণিজ্য  আলোচনার বিষয়ে উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা অবাধ করার বিষয়ে দৃঢ় সংকল্পের কথাও পুণরায় তুলে ধরা হয়। তবে এই শিখর সম্মেলন ব্যবসা বাণিজ্যকে ছাপিয়ে নয়াদিল্লি এবং ব্রাসেলসের মধ্যে সম্পর্কের আদানপ্রদানের ব্যপকতা তুলে ধরেছে। এই সম্মেলনে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন, অবাধ ও সুষ্ঠু বাণিজ্য, বৈদেশিক ও নিরাপত্তা নীতি, ডিজিটালাইজেশন, মানবাধিকার, দীর্ঘস্থায়ী আধুনিকীকরণ এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনের ওপরেও আলোকপাত করে।

ভারত ও ইইউর মধ্যে সম্পর্কে সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হ’ল রাজনৈতিক আদান প্রদানের প্রসার। ব্রাসেলস ২০২২ সালে জি – টোয়েন্টি সম্মেনে ভারতের সভাপতিপদ এবং ২০২১-২২’এ রাষ্ট্রসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সদস্যপদের দাবিকে স্বাগত জানিয়েছে।  এই দুটি বিষয়ই রাজনৈতিক নেতৃত্বদানের ক্ষেত্রে নয়াদিল্লির ক্রমবর্ধমান সক্ষমতাকেই তুলে ধরে।

পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ ও নিরস্ত্রীকরণ, সামুদ্রিক সুরক্ষা, সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলার (যাতে রয়েছে চরমপন্থার প্রসার রোধ, অর্থ তছরূপ রোধ, সন্ত্রাসবাদে অর্থ যোগান বন্ধ করা এবং সাইবার নিরাপত্তা’র মতো বিষয়) ক্ষেত্রে ঐকমত্যের মাধ্যমে উভয়পক্ষের মধ্যে বৈদেশিক ও নিরাপত্তা নীতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সহযোগিতার পরিধি আরো প্রসারিত হয়েছে।

ভারত ও ইইউ ইরান ও আফগানিস্তানের মতো আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়ে একযোগে কাজ করতে সম্মত হয়েছে। ২০২৫ সালের পথনির্দেশিকার মূল  লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে, বৈদেশিক ও নিরাপত্তা নীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার পরিসর বৃদ্ধি, সামরিক আদান প্রদান বাড়ানো এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে নিয়মিত আলোচনা ও পরামর্শ। শুধু জলদস্যু মোকাবিলাই নয়, সমুদ্র নিরাপত্তার বিষয়ে আমোচনার ক্ষেত্রেও সহযোগিতা প্রসারের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

কৌশলগত দিক থেকে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরের তাত্পর্য বৃদ্ধি পাওয়ায়,   নয়াদিল্লি এবং ব্রাসেলসের মধ্যে এটি একটি অত্যন্ত ইতিবাচক অগ্রগতি এবং  উভয়ই ভারত মহাসাগরে সুরক্ষা এবং স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব দিয়েছে। উভয় পক্ষই একে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রূপ দেওয়ার জন্য প্রয়াস  নিয়েছে যা মজবুত রাজনৈতিক সম্পর্কের দিকেই ইঙ্গিত করে।

প্রধানমন্ত্রী মোদী তার উদ্বোধনী ভাষণে বলেছিলেন, ভারত-ইইউ অংশীদারিত্ব কোভিড-১৯-পরবর্তী বিশ্বের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং মানব-কেন্দ্রিক বিশ্বায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে পারে। অভিবাসন ও (সিএএমএম) সম্পর্কিত চলমানতা সংক্রান্ত যৌথ ঘোষণা কার্যকর করার প্রেক্ষিতে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মানবাধিকার সংক্রান্ত আলোচনা পুনরায় শুরু করা এবং নাগরিক  সমাজের কর্মকান্ড ও আদানপ্রদান বাড়ানোর বিষয়েও সম্মেলনে ঐকমত্য হয়।

এছাড়াও, উভয় পক্ষই একটি অসামরিক পারমাণু সহযোগিতার বিষয়েও সম্মত হয়েছে  এবং একটি যৌথ প্রস্তাবও  করেছে। যদিও কোভিড – ১৯ অতিমারির ফলে এই বছরের মার্চ মাসে নির্ধারিত বৈঠক সম্ভব হয় নি, কিন্তু এই পরিস্থিতির ফলে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার আরও বহু ক্ষেত্র এর ফলে চিহ্নিত জকরা সম্ভব হয়েছে। ২০২৫’এর নতুন দিশা নির্দেশিকা, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে এই কৌশলগত অংশোদারিত্ব আরো মজবুত করার বিষয়ে উভয়ের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধতাই ইঙ্গিতবাহী।

(মূল রচনা – উম্মু সালমা বাভা)