উদ্ভাবনের মাধ্যমে জাতীয় বিকাশের উপায়

For Sharing

 বিশ্ব মেধা সম্পদ সংগঠনের বার্ষিক র‍্যাঙ্কিং-এ প্রথম ৫০টি উদ্ভাবনী  দেশের অন্যতম হিসেবে ভারত উঠে এসেছে। ভারত এখন ৪৮তম স্থানে বিরাজ করছে। বিশ্ব উদ্ভাবনী সূচক-২০২০তে ভারত চার ধাপ ওপরে উঠে এই স্থানে রয়েছে। 

র‍্যাঙ্কিং-এর শীর্ষ স্থানগুলিতে রয়েছে সুইৎজারল্যান্ড, সুইডেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং নেদারল্যান্ড। ভারত ধারাবাহিকভাবে এই র‍্যাঙ্কিং-এ উন্নতি করে চলেছে; ২০১৫ সালে ভারতের অবস্থান ছিল ৮১তম স্থানে, ২০১৯ সালে ভারত ছিল ৫২তম স্থানে আর ২০২০ সালে আরও চার ধাপ ওপরে উঠে ভারত ৪৮তম স্থানে অবস্থান করছে। 

এই র‍্যাঙ্কিং নলেজ ক্যাপিটাল (জ্ঞান ভান্ডার), প্রাণবন্ত স্টার্ট-আপ পরিবেশ এবং সরকারি ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থাগুলির অসাধারণ কাজের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে। 

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করেছেন এবং তিনি প্রতিটি মঞ্চেই এই বিষয়ে বলেছেন। দেশের ৭৪ তম স্বাধীনতা দিবসে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে শ্রী মোদি বলেন যে, “প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বের সম্মুখীন হতে ভারতকে উদ্ভাবনী হতেই হবে। তিনি বলেন, উন্নতির জন্য, দেশকে উদ্ভাবনী হতে হবে। উদ্ভাবনে যত জোর দেওয়া হবে ও গবেষণায় যত জোর দেওয়া হবে, প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে ভারত এগিয়ে যাওয়ার শক্তি পাবে”। 

জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০২০ নলেজ বা জ্ঞান সৃষ্টি ও উদ্ভাবনের জন্য সমগ্র শিক্ষা কাঠামোকেই নতুন করে তৈরি করেছে। জাতীয় শিক্ষা নীতি অনুসারে- “উচ্চ শিক্ষা জ্ঞান সৃষ্টি ও উদ্ভাবনের  ভিত্তি  তৈরি করবে এবং ফলস্বরূপ ক্রমবর্ধমান জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে সক্ষম হবে। গুণমানসম্পন্ন উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্য, ব্যক্তি কর্মসংস্থানের বৃহত্তর সুযোগ তৈরি করার থেকেও বেশি কিছু”। 

নীতি আয়োগ উদ্ভাবনকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দিয়েছে এবং এটিকে মোদি সরকারের একটি  প্রধান কর্মসূচী করেছে। বিজ্ঞানকে জাতীয় অগ্রাধিকারের  প্রথম সারিতে নিয়ে আসা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির নাম অনুসারে এটির নামাঙ্কন করা হয়েছে। তিনি জয় জওয়ান, জয় কিষাণ এই স্লোগানটির সঙ্গে জয় বিজ্ঞান-কেও সংযুক্ত করেছিলেন। অটল উদ্ভাবন মিশন আগামী দিনে ভারতের প্রয়োজনের ভিত্তিতে দেশ জুড়ে উদ্ভাবন ও শিল্পদ্যোগী মনোভাব তুলে ধরার চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করবে। 

কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের উদ্ভাবন নীতিসমূহকে এক সারিতে নিয়ে আসার এবং  উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলি, বিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং ও অন্য উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি সহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পক্ষেত্র, বাণিজ্যিক সংস্থা এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলির বিভিন্ন স্তরে উদ্ভাবন ও শিল্পোদ্যোগ পরিবেশকে তুলে ধরতে অটল উদ্ভাবন মিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। 

দেশের প্রধান প্রধান গবেষণা ক্ষেত্র যেমন বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা, কৃষি গবেষণা এবং চিকিৎসা গবেষণা ক্ষেত্রগুলিকে জাতীয় আর্থ সামাজিক প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে এর আওতায় আনা এই মিশনের একটি দীর্ঘ মেয়াদী লক্ষ্য। গবেষণা ও উদ্ভাবন যতক্ষণ না পরীক্ষাগারের চার দেওয়ালের বাইরে এসে মানব জীবনের সেবায় লাগছে, ভারত তার স্বনির্ভরতার স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্য ছুঁতে পারবে না। ৭০ বছর ধরে আমরা  বিদেশী উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারীদের বাজার হিসেবে কাজ করেছি এবং এখন এর ঠিক উল্টোটা করার সময় এসেছে।  

উদ্ভাবন এক মুক্ত মন ও মুক্ত পরিবেশ এবং  প্রশাসনিক শৃঙ্খল মুক্ত পরিস্থিতিতেই কেবলমাত্র বিকশিত হতে পারে। ভারতের বিজ্ঞান ও গবেষণা সংস্থাগুলির রূপান্তরণ ঘটিয়ে  আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের চালিকা শক্তি হিসেবে গড়ে তোলা সরকারের কাছে এক বড় চ্যালেঞ্জ। 

দেশের উন্নয়নে বেসরকারি ক্ষেত্রকেও যেহেতু সরকার এক সমান অংশীদার হিসেবে চায়, বেসরকারি শিল্পক্ষেত্রকেও গবেষণা, উন্নয়ন ও উদ্ভাবনের জন্য প্রয়াসী হতেই হবে। 

প্রাচীন কাল থেকেই ভারতীয়রা বিভিন্ন উদ্ভাবন করে এসেছে এবং দেশে উদ্ভাবনী প্রতিভার অভাব নেই। কিন্তু অন্য জায়গার মতোই, ভারতের মূল চ্যালেঞ্জ হ’ল স্থিতিশীল ও সুলভ আর্থিক ব্যবস্থাপনা। উদ্ভাবনকে সহায়তা করতে  সরকার যদিও বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে এসেছে তথাপি কল্পনা থেকে বাণিজ্যিকীকরণ, তার বিস্তার এবং অবশেষে এক দীর্ঘ-মেয়াদী বাণিজ্যিক স্থায়িত্বের এই উদ্ভাবন  চক্রে অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে দ্বিধা রয়েছে। 

বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক অতিমারি  প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দেশকে স্বাবলম্বী  হওয়ার এক শিক্ষা দিয়েছে যাতে ভারতকে বৈদেশিক সরবরাহের ওপর নির্ভর করে না থাকতে হয় কেননা সেই সরবরাহও এই সংকটকালেও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। 

প্রতিটি সংকটমুহূর্ত নতুন সুযোগ ও সৃজনশীলতার সম্ভাবনা নিয়ে আসে। বর্তমান অতিমারির আনুষঙ্গিক লাভ হল স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী সমাধানের আগ্রহ তৈরি হওয়া। এটি দূরে থেকে কাজ করা, দূর থেকে শিক্ষা লাভ এবং  ই-বাণিজ্যের মতো বহু ক্ষেত্রে ডিজিটাল মাধ্যমে কাজ করার বিষয়টিও তুলে ধরেছে। ভারত এখন উপলব্ধি করেছে, উদ্ভাবন বাড়ানো সম্ভব এমন এক পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে একটি সক্রিয় পরিবেশ তৈরি করার সুযোগটি গ্রহণ করা উচিত। সরকার গৃহীত সবকটি প্রয়াসকে ফলপ্রসূ করতে হলে সে সম্পর্কিত আর্থিক বিষয়টির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা উচিত।

 

(মূল রচনা- এন ভদ্রন নায়ার)