প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর রাশিয়া সফর

For Sharing

প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং গত সপ্তাহে মস্কো সফর করেন। তিনি , সাংহাই সহযোগিতা সংগঠন (এসসিও), সম্মিলিত সুরক্ষা চুক্তি সংস্থা (সিএসটিও)এবংদ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের ৭৫- তম বিজয় বার্ষিকী উপলক্ষে সিআইএস সদস্যদের সম্মিলিত বৈঠকে অংশ নেন। এ ছাড়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জেনারেল সের্গেই শোইগুর সাথেও সাক্ষাৎ করেন।

কোভিড -১৯ মহামারীর সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এটি ছিল দ্বিতীয় মস্কো সফর। ভারতের কৌশলগত স্বার্থকে আরও মজবুত করার ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা কূটনীতির গুরুত্ব কতখানি, তা সহজেই অনুমান করা যায় রাজনাথ সিং’এর এই দ্বিতীয়বার রাশিয়া সফরে। গত জুন মাসে রাজনাথ সিং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির স্মরণে রুশ বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে মিত্র শক্তির বিজয়ে সোভিয়েত সেনাবাহিনীকে সহায়তায় কয়েক মিলিয়ন ভারতীয় সেনার অবদানের কথা স্মরণ কোরতে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর তিনটি শাখার সেনারা ওই প্যারেডে অংশ নেন।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী তাঁর দ্বিতীয়বার রাশিয়া সিফরে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সহযোগিতা কীভাবে আরও গভীর করা যায় সে সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করেন। 2020 সালের 4-5 সেপ্টেম্বর মালাক্কা প্রণালীতে ইন্দ্র নামে ভারত-রুশ যৌথ নৌ মহড়ার সময়েই রাজনাথ সিং মস্কো সফরে গেলেন। এই যৌথ নৌ মহড়া ভারত মহাসাগর অঞ্চলে সামুদ্রিক সুরক্ষার প্রশ্নে দুটি দেশের অভিন্ন স্বার্থেরই প্রতীক।

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কিছু অস্ত্র সংগ্রহের জন্য ভারতের অনুরোধে রাশিয়ার পূর্ণ সহমতির জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রী সে দেশের সরকারের প্রশংসা করেন। “আত্মনির্ভর ভারত” গঠনের লক্ষ্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে “মেক ইন ইন্ডিয়া” প্রতিরক্ষা উত্পাদন যোজনায় রাশিয়ার অংশগ্রহণের বিষয়টি এবং স্থল সেনাদের জন্য একে -২৩৩ অ্যাসল্ট রাইফেল তৈরির জন্য ভারতের প্রস্তাবিত যৌথ উদ্যোগ প্রকল্প ছাড়াও ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত এয়ারো ইন্ডিয়া প্রদর্শনীতে রাশিয়ার অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ নিয়ে বৈঠকে আলোচনা করা হয়। সামরিক ও কারিগরি সহযোগিতা বিষয়ক আন্তঃসরকারী কমিশনের পরবর্তী সম্মেলন ভারতে ২০২০ সালের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হবে বলে ঘোষণা করা হয়।

এসসিও সম্মেলনে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর অংশগ্রহণ পরিবর্তিত বিশ্বে একটি অবাধ, স্বচ্ছ, সর্বাত্মক ও আন্তর্জাতিক আইন ভিত্তিক বিশ্বব্যাপী সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে ভারতের অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন। এই আইনগুলির রূপায়ণ রাষ্ট্রগুলির সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং কোনো দেশের বিরুদ্ধে একতরফা আগ্রাসন মূলক আচরণ থেকে বিরত থাকতে সংশ্লিষ্ট দেশের ওপর চাপ সৃষ্টিতে মৌলিক অবদান যুগিয়ে আসছে।

এসসিও সম্মেলনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং তাঁর ভাষণে তিনটি নির্দিষ্ট বিষয় তুলে ধরেন। আফগানিস্তান এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলির প্রসঙ্গে রাজনাথ সিং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সার্বভৌমত্ব এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার আদর্শের ভিত্তিতে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক মত পার্থক্যের সমাধানের আহ্বান জানিয়ে এই অঞ্চলের সাথে ভারতের যুগপ্রাচীন ঘনিষ্ট সম্পর্কের দিকটি তুলে ধরেন। তিনি, এসসিও কাউন্সিলের সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ গ্রহণকে এবং চরম পন্থী ভাবাদর্শ ও সন্ত্রাসবাদ দমনে সাইবার সহযোগিতাকে স্বাগত জানিয়েছেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান এবং কাজাখস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতার দিকগুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
এসসিও বৈঠকে চীনের জেনারেল ওয়েই ফেঙ্গি, স্টেট কাউন্সিলর এবং চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তাঁদের মধ্যে অত্যন্ত খোলামেলা ও আন্তরিক আলোচনায় শ্রী সিং গত কয়েক মাসে ভারত-চীন সীমান্তের পশ্চিমাঞ্চলের গালওয়ান উপত্যকাসহ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার (এলএসি) পরিস্থিতির বিষয়ে নতুন দিল্লির সুস্পষ্ট অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ভারতীয় সেনারা বরাবরই সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে অত্যন্ত দায়িত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে আসছে; তবে সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার ক্ষেত্রে ভারতের দৃঢ় সংকল্পের বিষয়টি তিনি দ্বর্থ্যহীন ভাষায় তুলে ধরেন।
পরিস্থিতি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে উভয়পক্ষকে একযোগে কাজ করা উচিত বলে চীনা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী যে অভিমত ব্যক্ত করেন, তার প্রেক্ষিতে রাজনাথ সিং বলেন, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং মতপার্থক্য যাতে বিবাদে পরিণত না হয় তা সুনিশ্চিত কোরতে দুটি পক্ষকেই সমানভাবে সক্রিয় থাকতে হবে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী তাঁর রাশিয়া সফর সম্পন্ন কোরে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার উদ্দেশ্যে স্বদেশে প্রত্যবর্তনের পথে তেহেরানে যাত্রা বিরতি করেন। (মূল রচনাঃ-অশোক কুমার মুখার্জী)