BRICS বিদেশ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক

For Sharing

চলতি অতিমারির জেরে বিশ্ব শিখর সম্মেলন এবং শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকগুলি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী দেশগুলির নেতৃবৃন্দ একস্থানে উপস্থিত হলে সদস্য দেশগুলির মধ্যে দেওয়া নেওয়ার মত পারস্পরিক বোঝাপড়ার বিষয়গুলি সহজ হয়ে যায়। তাই যখন এই শীর্ষ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ অনলাইনের মাধ্যমে একত্রিত হন, তখন ডিজিটাল দুনিয়ার বিশালতায় তা বাধাপ্রাপ্ত হয়। শিখর বৈঠকের ফাঁকে ফাঁকে অবসরের সময়গুলি যেমন চা বা নৈশভোজের সময়ে নতুন কৌশল গ্রহণ করা বা নির্দিষ্ট পদের সমর্থন ইত্যাদি বিষয়ে একে অপরের সঙ্গে আলোচনার যে সুযোগ ঘটে ডিজিটাল মাধ্যমে করা বৈঠকে তা সম্ভব হয়ে ওঠে না।
BRICS শিখর সম্মেলন সাধারণত জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে কিন্তু করোনা অতিমারির জেরে তা পিছিয়ে অক্টোবরে করা হয়। মস্কো এই দেশগোষ্ঠীর বিদেশ মন্ত্রী এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের মধ্যে সামনাসামনি বৈঠকে আগ্রহী ছিল। ভারতও ২০২১ সালে ব্রিকস সভাপতিত্বের দায়িত্ব গ্রহণের সাথে সাথে তাতে সমর্থন জানিয়েছিল।
রাষ্ট্রসংঘের ৭৫তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ব্রিকস বিদেশ মন্ত্রীদের মধ্যে বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতি এবং রাষ্ট্রসংঘের ৭৫তম সাধারণ পরিষদের এজেন্ডাই মূল আলোচ্য বিষয় ছিল।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সমসাময়িক বৈশ্বিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রসংঘের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি স্থায়ী ও অস্থায়ী উভয় বিভাগেই রাষ্ট্রসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সম্প্রসারণের ওপর জোর দিয়েছিলেন। বহুপাক্ষিকতার প্রতি ভারতের প্রতিশ্রুতি অপরিবর্তিত রয়েছে যদিও ভারত রাষ্ট্রসংঘ, WTO, IMF, WHO ইত্যাদির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির সংস্কারের স্বপক্ষে মত পোষণ করে।
ভারত তার সরকার, শান্তিবাহিনী, ভারতীয় পণ্ডিতদের কাজ এবং আন্তর্জাতিক অসামরিক কর্মচারীদের প্রচেষ্টার মাধ্যমে রাষ্ট্রসংঘে বিরাট অবদান রেখেছে। উন্নয়নশীল বিশ্বের স্বার্থে রাষ্ট্রসংঘের এজেন্ডা গঠনে সহায়তা করতে ভারত অন্যতম দেশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যদিও এখনও নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের বিষয়ে স্থিতাবস্থা কাটিয়ে ওঠা যায় নি। মনে করা হয় যে, নির্দিষ্ট কিছু দেশের বহুপাক্ষিক কূটনীতির ফলেই এই অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না। ভারত মনে করে কিছু দেশের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই প্রাথমিক সংস্কার বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডঃ জয়শঙ্কর বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষেত্রে আত্মনির্ভর ভারত উদ্যোগ কিভাবে গতিশীল ও পারস্পরিক লাভজনক হয়ে উঠতে পারে তা ব্যাখা করে বলেছেন, এই উদ্যোগ দ্রুত বৃদ্ধি ও বিকাশ অর্জনের মূল চাবিকাঠি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রী ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসবাদের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন এবং এর মোকাবিলায় ব্রিক্স দেশগোষ্ঠীর মধ্যে সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় করার আহ্বান জানান। তিনি ব্রিক্স সন্ত্রাস মোকাবিলা কৌশলের সমাধানের বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এই বৈঠকে সব ধরণের সন্ত্রাসবাদের তীব্র নিন্দা করা হয়েছে।
ব্রিক্স বিদেশ মন্ত্রীরা করোনা অতিমারি মোকাবিলার বিষয়েও আলোচনা করেছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা WHO’র ভূমিকার প্রশংসা করে বিদেশ মন্ত্রীরা এই বিশ্ব সংস্থার প্রতি ব্রিক্স দেশগোষ্ঠীর অবদান আরও সম্প্রসারিত করার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। এই বৈঠকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার এবং উন্নয়নের অধিকার বিষয়ে কোভিড-১৯ অতিমারির যে বিরূপ প্রভাব পড়েছে তা মোকাবিলার জন্য আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ভারত কোভিড-১৯ মোকাবিলায় ১৫০টিরও বেশি দেশকে সহায়তা করেছে।
চীনের আগ্রাসনমূলক ভূমিকা এবং WTO, BRICS- এর মত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিকে দুর্বল করার মনোভাব যদি অব্যাহত থাকে তবে ভারতকে ক্রমশ এই গোষ্ঠীগুলি থেকে দূরে সরে যেতে হবে। ইতিমধ্যেই চীনের আগ্রাসনমূলক মনোভাবের জন্য ভারত চীনের সাথে সম্পর্কের বেশ কিছু বিষয় হ্রাস করতে বাধ্য হয়েছে। অনেকের মতে, BRICS এবং SCO-এর পরিবর্তে ভারতের “কোয়াড প্লাস” কৌশল অবলম্বন করা উচিত, যাতে ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া এবং সিঙ্গাপুর অন্তর্ভুক্ত হবে। চীন যদি নিজেদের স্বার্থে নতুন করে নিয়ম তৈরি করে তাহলে তা শুধু যে নীতি ভিত্তিক আন্তর্জাতিক আদেশকে ক্ষুণ্ণ করবে তা নয় ব্রিক্স দেশগোষ্ঠীর ভবিষ্যতের সামনেও একটা বিরাট প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়াবে। ( মূল রচনাঃ অ্যাশ নারায়ণ রায়)