ভারত-ইরান সম্পর্কে মজবুতি

For Sharing

এক সপ্তাহের মধ্যে ভারতের দুজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীর ইরান সফর ভারত ও ইরানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও মজবুত করার পথে গতি আনল। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং রাশিয়ায় সাঙ্ঘাই সহযোগিতা সংগঠনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের বৈঠক শেষে ফেরার পথে গত রবিবার ইরান সফর করলেন। তেহেরানে, শ্রী সিং ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমীর হাতামির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। উভয় নেতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহ পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডঃ এস জয়শঙ্করও মস্কো যাবার পথে ইরানের বিদেশ মন্ত্রী মহম্মদ জাভেদ জাফরির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং উভয়ের মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। উভয় পক্ষ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও মজবুত করার বিষয়ে আলোচনা করেন। দুই মন্ত্রী এই বৈঠকে আঞ্চলিক উন্নয়ন নিয়েও পর্যালোচনা করেন।
উল্লেখ্য, ডঃ জয়শঙ্কর ২০১৯ সালে ভারত-ইরান যৌথ কমিশনের ১৯তম বৈঠকে যোগ দিতে ইরান সফর করেছিলেন। ইরানের বিদেশ মন্ত্রী ডঃ জাভেদ জাফরি এ বছর জানুয়ারি মাসে ‘রাইসিনা আলোচনা ২০২০’তে যোগ দিতে ভারতে এসেছিলেন। উল্লেখ্য, কোভিড-১৯ অতিমারির জেরে বিদেশ সফর নিষিদ্ধ হবার পর ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রীর এটিই প্রথম বিদেশ সফর। এতেই প্রমাণিত হচ্ছে যে, ভারত ও ইরান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কতখানি গুরুত্ব দিচ্ছে বিশেষ করে সেই সময় যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশের সঙ্গে তেহেরানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ কম করার জন্য ইরানের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করার প্রচার চালাচ্ছে।
ভারতের দুই মন্ত্রীর ইরান সফর এমন এক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে হল যখন ইরান ও চীন তাদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক দীর্ঘ মেয়াদী করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। মনে করা হচ্ছে, চীন তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ BRI’এ ইরানে বিপুল পরিমাণে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তেহেরানের সঙ্গে ২৫ বছরের জন্য দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত সহযোগিতা জোরদার করতে চাইছে।
দুই ভারতীয় মন্ত্রীর ইরান সফরের সময়ই আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আন্তঃ আফগান আলোচনাও অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ভারত ও ইরানের বিদেশ মন্ত্রী অন্যান্য আঞ্চলিক এবং দ্বিপাক্ষিক বিষয় ছাড়াও আফগানিস্তানের বিষয়েও আলোচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়াও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা বাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টার পরেই এই সফর। উল্লেখ্য, এ বছর অক্টোবরে এই নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা শেষ হবে।
ভারত ও ইরানের মধ্যে যুগপ্রাচীন সম্পর্ক রয়েছে। চাবাহার বন্দর এবং চাবাহার-জাহেদান রেল লাইন প্রকল্প ফলপ্রসূ ও অগ্রগতির ফলে সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও গভীর হয়েছে। ভারত ও ইরান বর্তমানে চাবাহার বন্দরের ব্যবহার আরও বাড়াবার বিষয়ে সক্রিয়ভাবে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। লক্ষণীয় বিষয় হল, দু দেশের মধ্যে চাবাহার-জাহেদেন রেল লাইন প্রকল্পে সহযোগিতা পর্যালোচনার জন্য গত মাসেই ইরানের উপ মন্ত্রী তথা ইরান রেলের প্রধান সঈদ রসৌলি ইরানে ভারতীয় প্রতিনিধিকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন।
যদিও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত আর্থিক নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের সঙ্গে ভারতের সাম্প্রতিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব পড়ছে তা সত্ত্বেও ভারত ও ইরান তাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক মজবুত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ভারতের জন্য দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রসারিত প্রতিবেশী দেশ এবং ভারতের জন্য ইরান আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশ। একইভাবে, ইরানের জন্য ভারত ইরানীয় পণ্যের এক সম্ভাবনাময় বিশাল বাজার এবং ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারি প্রধান দেশ।
মধ্য প্রাচ্যের সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ফলে বহির্বিশ্বের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘস্থায়ী কোভিড-১৯ অতিমারির প্রভাবে এই প্রতিবন্ধকতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
মূল কথা হল, কোভিড অতিমারির ফলে বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হবার অব্যবহিত পরেই ভারতের দুই মন্ত্রীর তেহেরান সফর ভারতের কাছে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্বই প্রমাণ করছে। ভারত ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক আরও গভীর হতে এই সফর সহায়ক হবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
( মূল রচনাঃ ডঃ আসিফ শুজা)