ভারত এখন হাইপারসনিক ক্লাবের সদস্য

For Sharing

ভারত দেশীয়ভাবে স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিন চালিত হাইপারসনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ চালকবিহীন আকাশযান পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করেছে। পরবর্তী প্রজন্মের হাইপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপনাস্ত্রের ক্ষেত্রে এই আকাশযান বিশেষভাবে সাহায্য করবে। ভারতের  প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা এটি তৈরি করেছে। এটি নিঃসন্দেহে প্রযুক্তিক্ষেত্রে এক বড় সাফল্য। হাইপারসনিক বা শব্দের চেয়ে প্রায় ৫ গুণ গতি সম্পন্ন স্ক্র্যামজেট  ইঞ্জিন চালিত এই চালক বিহীন বিমানটি খুব কম সময়ে আকাশে এক নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছে যেতে পারে। এর সফল পরীক্ষণের ফলে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, সামগ্রী ও হাইপারসনিক যান তৈরির পথ সুগম হয়ে গেল। পরবর্তী পর্যায়ে প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা আগামী  পাঁচ থেকে ছয় বছরের মধ্যে দূর পাল্লার হাইপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপনাস্ত্র তৈরির আশাও করছে।  

একটি প্রক্ষিপ্ত বস্তু যখন শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি গতিবেগ প্রাপ্ত হয় তখন সেটিকে হাইপারসনিক গতিবেগে ধাবমান বস্তু বলা হয়ে থাকে। এখনও পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন হাইপারসনিক ক্ষেপনাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা প্রাপ্ত করে হাইপারসনিক ক্লাবের মর্যাদা পেয়েছিল। এখন ভারত এই বিশেষ ক্লাবের চতুর্থ সদস্য হয়ে গেল। 

 বঙ্গোপসাগরে ওড়িশা উপকূলে ডক্টর আব্দুল কালাম দ্বীপ থেকে ভারত এই সফল পরীক্ষণটি করে। স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিন চালিত হাইপারসনিক ক্রুজ যানটি ২২ থেকে ২৪ সেকেন্ডের মধ্যেই শব্দের চেয়ে ৬ গুণ গতিবেগ প্রাপ্ত হতে সক্ষম হয়।  একাধিক বিষয় ট্র্যাক করতে পারে এমন র‍্যাডার, ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল ব্যবস্থাপনা এবং টেলিমেট্রি স্টেশনের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্নভাবে  এর যাত্রা পথ ও অন্যান্য প্রযুক্তির বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। হাইপারসনিক যানের ক্রুজ পর্যায়ের সময় তার সক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করতে বঙ্গোপসাগরে একটি জাহাজও মোতায়েন করা হয়েছিল। সমস্ত কর্মক্ষমতা পর্যবেক্ষণের পরে এই মিশনটিকে চরম সফল বলে বর্ণনা করা হয়েছে। 

এটি যদিও এক বড় সাফল্য, তবুও কয়েক মিনিটের জন্য স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিন চালিত হাইপারসনিক আকাশ যান চালনায় ভারতকে এখনও সফল হতে হবে যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া বা চীন ইতিমধ্যেই অর্জন করে ফেলেছে। আসলে এই তিন দেশ, শত্রুপক্ষের ক্ষেপনাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনাকে ধ্বংস করতে পারে এমন এরোডাইনামিক চালিত হাইপারসনিক অস্ত্র বিকাশের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রয়েছে। 

ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে ভারত-রুশ যৌথ উদ্যোগে তৈরি র‍্যামজেট চালিত ব্রহ্মোস সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপনাস্ত্র ইতিমধ্যেই রয়েছে যা শব্দের চেয়ে ২.৮ গুণ বেশি বেগে ধাবিত হতে পারে। র‍্যামজেট হল এয়ারব্রেদিং কম্বাশন জেট ইঞ্জিনের এক প্রকারভেদ যাতে দহন প্রক্রিয়াটি সুপারসনিক বায়ুপ্রবাহে ইঞ্জিনের এগিয়ে যাওয়ার গতিবেগকে ব্যবহার করে কোনো অক্ষীয় বা কেদ্রাতীগ কম্প্রেসরের সাহায্য ছাড়াই আগত বায়ুকে সংকোচন করার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। সুপারসনিক কম্বাশন র‍্যামজেট বা স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিন, আগত বাতাস সংকোচন ও মন্দিত করতে বিমানের উচ্চ গতির ওপর নির্ভর করে। কিন্তু র‍্যামজেট ইঞ্জিন বাতাসকে দহনের পূর্বে সাবসনিক গতিতে নামিয়ে আনে এবং অন্যদিকে, স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিনে সুপারসনিক বেগের বাতাস পুরো ইঞ্জিনের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়।  

 

র‍্যামজেট ইঞ্জিন শব্দের চেয়ে ৩ গুণ বেশি গতিবেগ বা মাক ৩ গতিবেগে সবথেকে ভালো কাজ করে এবং এটি মাক ৬ গতিবেগ পর্যন্তও কাজ করতে সক্ষম। তবে র‍্যামজেট ইঞ্জিনের কর্মক্ষমতা বিমানটি হাইপারসনিক গতিবেগে পৌঁছনোর পরে কমে যায়। অন্যদিকে, স্ক্র্যামজেট হাইপারসনিক গতিবেগেও ভালো কাজ করে এবং সেই গতিবেগের সুপারসনিক দহনেও সক্ষম। 

হাইপারসনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ চালকবিহীন আকাশযানের জটিল প্রযুক্তির কম খরচে ছোটো ছোটো কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপনের মতো কিছু অসামরিক প্রয়োগও রয়েছে। বর্তমানে কৃত্রিম উপগ্রহ কক্ষপথে পাঠানো হয় বহু স্তরীয় উপগ্রহ উৎক্ষেপন যানের মাধ্যমে যা একবারই ব্যবহার করা যায় এবং  ফলে তা ব্যবহুলও হয়ে পড়ে। এছাড়াও তাদের কর্মক্ষমতাও অনেকটা কম কেননা তারা তাদের ২-৪ শতাংশ ভরকে কক্ষপথে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এছাড়াও এখনকার উৎক্ষেপন যানের প্রোপালেন্টের ৭০ শতাংশ অক্সিডাইজার যা দহনের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন প্রদান করে থাকে। পরবর্তী প্রজন্মের উৎক্ষেপন যান যার প্রপালসান ব্যবস্থাপনা আকাশে চলার পথে পরিবেশের অক্সিজেন ব্যবহার করতে সক্ষম হওয়ায় কক্ষপথে কৃত্রিম উপগ্রহ স্থাপন করার খরচ বহুলাংশে কমানো সম্ভব হবে। স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিন চালিত আকাশযান তা অর্জন করতে পারে।

 

[মূল রচনা- বিমান বসু]