ভারত-আসিয়ান বহুমুখী সম্পর্ক

For Sharing

১৯৯০’এর দশক থেকে সারাবিশ্বে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্তরে ব্যাপক পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সমিতি আসিয়ানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ক্রমশ মজবুত ও বহুমুখী হয়ে উঠছে। ভারতের পূবে সক্রিয় হও নীতি আজ একটি গতিশীল কর্মপরিকল্পনা ভিত্তিক নীতিতে পরিণত হয়েছে।২০১৪’র নভেম্বরে মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত দ্বাদশতম আশিয়ান-ভারত শিখর সম্মেলন ও নবম পূর্ব এশীয় শিখর সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নতুন দিল্লির পূর্বে সক্রিয় হও নীতিটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেন।
আশিয়ান ছাড়াও ভারত, বিমসটেক ও এমজিসি’র মত কিছু দেশ গোষ্ঠীর সঙ্গে নীতিগত সম্পর্ক স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ভারত asia-europe বৈঠক, পূর্ব এশীয় শিখর সম্মেলন, আশিয়ান আঞ্চলিক মঞ্চ, আসিয়ান প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের বৈঠক এবং সম্প্রসারিত আসিয়ান সমুদ্রাঞ্চল ফোরামে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
আশিয়ান দেশ গোষ্ঠীর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নতুন দিল্লির পূবে তাকাও নীতির ভিত্তিস্বরূপ। ২০১২ সালে ভারত আসিয়ানের সঙ্গে তার সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারিত্ব পর্যায়ে উন্নীত করে। নতুন দিল্লি ১৯৯২ সালে আসিয়ানের ক্ষেত্রীয় অংশীদার হয়। ১৯৯৬’এ বার্তালাপ অংশীদার এবং ২০০২ সালে শিখর সম্মেলন স্তরীয় অংশীদার হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে আসিয়ানের সঙ্গে ভারতের ৩০ টি বার্তালাপ ব্যবস্থাপনা রয়েছে। ২০১৫ সালে জাকার্তায় ভারত আসিয়ানের জন্য একটি স্বতন্ত্র মিশন স্থাপন করেছে এই সম্পর্ককে স্পষ্ট রুপ দিতে রাষ্ট্রদূত পর্যায়ে একজন কুটনীতিবিদকে নিয়োগ করা হয়েছে।
ভারত, তার পররাষ্ট্র নীতিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি কোরতে আশিয়ান দেশগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা ও যোগাযোগ বৃদ্ধির বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের তোরণ দ্বার হিসেবে পরিচিত। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে এই উত্তর-পূর্বাঞ্চল প্রতিবেশী প্রথম ও পূবে সক্রিয় হও নীতির রূপায়ণে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করছে
ভারতের উদ্দেশ্য হলো যোগাযোগ, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক অভিন্নতা- এই তিনটি বিষয়ের ভিত্তিতে আশিয়ান দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমশ নিবিড় করা। এ ছাড়া,পূর্ব এশিয়ায় আমাদের প্রতিবেশী ও মিত্র রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে আমাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য গুলির পরিকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধনে নতুন দিল্লি ক্রমাগত তৎপর হচ্ছে। এর ফলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য গুলির মধ্যে একটি আঞ্চলিক অখন্ডতা ও সংহতির আদর্শ গড়ে উঠেছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডঃ এস জয়শঙ্কর গত সপ্তাহে থাইল্যান্ডে আশিয়ান- ভারত মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে সে দেশের উপপ্রধানমন্ত্রী ও বিদেশ সংক্রান্ত মন্ত্রীর সঙ্গে যৌথভাবে পৌরোহিত্য করেন। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ভারত ও আসিয়ানভুক্ত ১০ টি দেশের বিদেশ মন্ত্রী অংশগ্রহণ করেন।
বৈঠকে আশিয়ান -ভারত কৌশলগত অংশীদারিত্বের সামগ্রিক বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়। এই সব বিষয়ের মধ্যে ছিল সমুদ্র সহযোগিতা, যোগাযোগ,‌ শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং,জন সম্পর্ক। বৈঠকে আশিয়ান -ভারত কর্মপরিকল্পনা ২০১৬-২০২০ রূপায়ণের অগ্রগতি খতিয়ে দেখা হয়। এছাড়াও সপ্তদশ তম আশিয়ান- ভারত শিখর সম্মেলনের প্রস্তুতি খতিয়ে দেখা হয়। এরই সঙ্গে ২০১৯’এর নভেম্বরে অনুষ্ঠিত ষোড়শ তম আশিয়ান -ভারত শিখর সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত গুলির রূপায়ণের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়।

২০২১-২০২৫ আশিয়ান-ভারত নতুন কর্মপরিকল্পনাও এই বৈঠকে গৃহীত হয়। মন্ত্রীগণ কোভিড-১৯ অতিমারির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা আরো মজবুত করার পন্থা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেন। তাছাড়া বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ঘটনাক্রম সম্পর্কেও তাঁরা মতবিনিময় করেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভি মুরালিথরণ ভিয়েতনামের পৌরহিত্যে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আয়োজিত আশিয়ান আঞ্চলিক মঞ্চের বিদেশ মন্ত্রীদের বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন।
২৭-তম এআরএফ বিদেশ মন্ত্রীদের বৈঠকে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়েও মত বিনিময় হয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভারত প্রশান্ত-মহাসাগরীয় অঞ্চল ছাড়াও সন্ত্রাসবাদ জনিত বিপদ, সমুদ্র বিষয়ক নানা প্রসঙ্গ এবং কোভিড-১৯ সংক্রমণ মোকাবিলায় যৌথ প্রয়াসের বিষয়েও কথা বলেন।
আশিয়ান আঞ্চলিক ফোরামে মন্ত্রীগণ তিনটি প্রস্তাব গ্রহণ করেন, যেমন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সহযোগিতা, বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর নিযুক্ত ও সেগুলির সঙ্গে যুক্ত শিশুদের মানসিক চিকিৎসা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সহযোগিতা।
ভারত, আসিয়ান আঞ্চলিক ফোরাম, সমুদ্র নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয়ে নিয়মিত আলাপ আলোচনা অব্যাহত রেখেছে। ২০২০-২১’এর জন্য এআরএফ’এর আওতায় এই সংস্থার যে কাজকর্ম অনুমোদিত হয় তার ভিত্তিতে ভারত আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও বন্দর নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং সমুদ্র আইন বিষয়ক রাষ্ট্রসংঘ চুক্তি রূপায়ণ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় নির্ধারিত কর্মশালায় যুগ্মভাবে পৌরোহিত্য করবে। (মূল রচনাঃ- পদম সিং)