দোহায় আন্তঃ আফগান আলোচনা

For Sharing

দোহায় ১২ই সেপ্টেম্বর আফগান সরকার ও তালিবানদের মধ্যে বহু প্রতীক্ষিত শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে। এর আগে মার্চ মাসে এই শান্তি আলোচনা হবার কথা ছিল কিন্তু আলোচনার পূর্ব শর্ত অনুসারে তালিবানরা জেলে বন্দী কয়েদীদের আদানপ্রদানের বিষয়ে শর্ত আরোপ করলে আফগান সরকার তা অস্বীকার করে। ফলে এই শান্তি আলোচনা বানচাল হয়ে যায়। এই আলোচনা তালিবান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতার অংশ ছিল। জেলে বন্দী মার্কিন বাহিনীর মুক্তির পথ সহজ করার লক্ষ্যেই এই শর্ত। তালিবানরা আফগানিস্তানে ৫০০০-এরও বেশি কারাবন্দীর মুক্তি চেয়েছিল। অন্যদিকে, আফগানিস্তানের আশরফ ঘানি সরকারের আলোচনার পূর্ব শর্ত ছিল হিংসা বন্ধ করা। মার্কিন চাপের ফলে কাবুল যত শীঘ্র সম্ভব আলোচনা শুরু করার ওপর জোর দেয়। তালিবানরা হিংসা এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আরও অধিক অঞ্চল দখলে নেওয়ার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আফগান সরকার আলোচনা শুরু করতে বাধ্য হয়েছিল।
তালিবানদের পক্ষ থেকে পূর্ববর্তী ইসলামিক আমীরশাহীর প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি শেখ আব্বাস স্টানিকজাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এছাড়াও রয়েছেন আনস হাক্কানি। আফগান সরকারের পক্ষ থেকে এই আলোচনায় মাসুম স্টানেকজাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অন্যান্যদের মধ্যে রয়েছেন, হানিফ আতমার এবং প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির প্রার্থী এবং জাতীয় পুনর্মিলন সংক্রান্ত আফগানিস্তানের হাই কাউন্সিলের চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন-তালিবান চুক্তির অঙ্গ হিসেবে পূর্বেকার আন্তঃ-আফগান আলোচনা শুরু হওয়ার পরে উভয় পক্ষের মধ্যে এটিই প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। ২০১৯ সালে মস্কোর রাশিয়ায় তালিবান এবং আফগান প্রতিনিধিরা আন্তঃ-আফগান আলোচনার জন্য মিলিত হয়েছিল। আফগান সরকার সর্বদা তালিবানদের সঙ্গে আলোচনার এবং আন্তঃ আফগান আলোচনার পক্ষে ছিল। কিন্তু তালিবানরা কেবলমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী ছিল এই কারণ দেখিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করে আসছিলো। । তালিবানরা সর্বদা তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দল হিসাবে স্বীকৃতি না দেওয়ার জন্য এবং হিংসার সাহায্য নিয়ে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি করতে চাইছিলো। আন্তর্জাতিক সংলাপকারীদের প্রচেষ্টার পরে এবং বেশ কয়েকটি দেশ বিশেষত পাকিস্তান যারা সর্বদা তালিবানের পৃষ্ঠপোষকতা করে চলেছে, তাদের বারংবার অনুরোধের পর শেষ পর্যন্ত তালিবান আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছে। উল্লেখ্য, পাকিস্তান সর্বদা তালিবানদের সমর্থন করে আসছে।
আফগানিস্তানের সরকারের মূল প্রচেষ্টা হল নারীর ক্ষমতায়ন ও শিক্ষার সাথে সম্পর্কিত প্রগতিশীল আইনগুলির সংরক্ষণ। যদিও মনে করা হচ্ছে, আলোচনার ফলে “ইসলামীক আমিরাত” ফিরে আসার পথ প্রশস্ত হবে। আফগান সরকার আলোচনার অগ্রগতির জন্য যুদ্ধ বিরতির বিষয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী। তালিবানরা আফগানিস্তানে ইসলামিক সংবিধান প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
দোহায় আলোচনা শুরু হবার আগে, মুল্লাহ বারাদারের নেতৃত্বে তালিবার প্রতিনিধিরা ইসলামাবাদ সফর করেছেন এবং পাক নেতাদের সঙ্গে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন। ঐ বৈঠকে ISI প্রধানও উপস্থিত ছিলেন। এতেই প্রমাণিত হচ্ছে যে, তালিবানদের ওপর ইসলামাবাদের প্রভাব কতটা গভীর। এই বিষয়টি ভারতের জন্য গভীর উদ্বেগের ব্যাপার। উল্লেখ করা প্রয়োজন, তালিবান জমানায় আফগানিস্তানের ভূমি ব্যবহার করে পাকিস্তানের মদতে সন্ত্রাসবাদীরা ভারতে হামলা চালাচ্ছিল। যদিও ভারত আন্তরিকভাবে চায় এই শান্তি আলোচনা সফল হোক এবং আফগানিস্তানে ক্ষমতা বন্টনের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি বজায় থাকুক। উল্লেখ্য, ভারত আফগানিস্তানে একাধিক বিকাশশীল প্রকল্প গড়ে তুলছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর আফগানিস্তানের বিষয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছেন। বৈঠকের উদ্বোধনী আলোচনায় ডঃ জয়শঙ্কর বলেছেন, ভারত আফগান-নেতৃত্বাধীন, আফগান-মালিকানাধীন এবং আফগান-নিয়ন্ত্রিত শান্তি প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী এবং ভারত আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করে এবং আফগানিস্তানে গণতান্ত্রিক ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অগ্রগতি বজায় থাকুক- এই অভিমত পোষণ করে। সংখ্যালঘু, মহিলা এবং সমাজের দুর্বল শ্রেণীর স্বার্থ সংরক্ষণ করতে হবে এবং দেশ ও তার আশেপাশের অঞ্চলে হিংসা ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি কার্যকরভাবে সমাধান করতে হবে।
এই আলোচনার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। ডঃ জয়শঙ্কর দোহা শান্তি আলোচনার সাফল্যের জন্য “জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখন্ডতা”র প্রতি শ্রদ্ধা রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। আফগানিস্তানে এক শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের আশু প্রয়োজন। ভারত এমন এক আফগানিস্তান দেখতে চায় যেখানে শান্তি বজায় থাকে। এর ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তাও বজায় থাকবে। আফগানিস্তানের শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর ভারতেরও অনেক কিছু নির্ভর করছে। ( মূল রচনাঃ ডঃ স্মৃতি এস পটনায়ক)