ভারত মিয়ানমার সম্পর্ক নতুন পথে

For Sharing

ভারত তার “প্রতিবেশী প্রথম ” এবং “পুবে কাজ করার নীতি” অনুসারে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে উচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করে। পারস্পরিক আস্থা ও সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ট করার লক্ষ্যে মিয়ানমার সরকার এবং সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে সর্বদাই সচেষ্ট থাকে। কোভিড ১৯ অতিমারির ফলে বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্বেও ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল এম এম নারভানে এবং পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা মিয়ানমার সফর করেছেন।
এই সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে যে ধারাবাহিক অগ্রগতি হয়েছে তা পর্যালোচনা করার একটি সুযোগ প্রদান করে। উভয় দেশ বহু বছর ধরে এশিয়া ও বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক বহুপাক্ষিক সংস্থায় সহযোগিতা ছাড়াও জ্বালানি সুরক্ষার জন্য অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। কৌশলগত দিক থেকেও ভারতীয় সেনা প্রধান এবং পররাষ্ট্রসচিবের যৌথ সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। ভারত ও মিয়ানমার উভয়ই সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়েছে।
মিয়ানমার-নেতৃত্বও উচ্চ পদস্থ ভারতীয় কর্মকর্তাদের এই সফরকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর, অং সান সু চি এবং প্রতিরক্ষা পরিষেবার কমান্ডার ইন চীফ সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং সফররত ভারতীয় অতিথিদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যতের গতি-প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে, মিয়ানমার সশস্ত্র বাহিনীর উপ-অধিনায়ক, সিনিয়র জেনারেল সো উইন দুটি সেনাবাহিনীর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করার জন্য নতুন পদক্ষেপের বিষয়ে ভারতীয় সেনাপ্রধানের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন; অন্যদিকে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের স্থায়ী সচিব ইউ সো হান পৃথকভাবে ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিবের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক তাত্পর্যপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
কর্মকর্তারা মিয়ানমারে বেশ কয়েকটি উচ্চমূল্যের পরিকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে যে অগ্রগতি হয়েছে তা নিয়ে কথাবার্তা বলেছেন, এই প্রকল্পগুলির মূল্য ১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। দুটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্ল্যাগশিপ কানেকটিভিটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, এগুলি হল, মিয়ানমার হয়ে কলকাতা ও ব্যাংককের মধ্যে সংযোগসৃষ্টিকারী তৃপাক্ষিক মহাসড়ক এবং কালদান মাল্টি-মডেল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট। এই দুটি প্রকল্প সম্পূর্ণ হলে উভয় দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক অবদান যোগাবে বলে আশা করা যায়। রাখাইন প্রদেশ উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় উভয় পক্ষ সন্তোষ প্রকাশ করেছে এবং উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা উল্লেখ করেছে। ভারতের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে পররাষ্ট্র সচিব সফরকালে সফটওয়্যার বিকাশ ও প্রশিক্ষণের একটি কেন্দ্রের উদ্বোধন করেন ।
উন্নয়ন প্রকল্পগুলির অগ্রগতি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি উভয় পক্ষ তাদের সীমান্ত অঞ্চলে সুরক্ষা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় বিশেষ জোর দিয়ে বর্তমান সুরক্ষা সহযোগিতা পর্যালোচনা করে। উভয় পক্ষই নিজেদের ভূখন্ডকে পরস্পরের পক্ষে ক্ষতিকর কার্যকলাপের জন্য ব্যবহার না করার বিষয়ে তাদের পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। বিভিন্ন বৈরি গোষ্ঠীর ২২ জন সদস্যকে ভারতে হস্তান্তর করায় ভারতীয় পক্ষ মিয়ানমারের প্রশংসা করেছে।
কোভিড -১৯ সংকটের সময়ে বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীকে সাহায্য করার ভারতের নৈতিক দায়িত্বের অংগ হিসাবে পররাষ্ট্রসচিব এবং সেনাপ্রধান ৩০০০ শিশি রেমডেসিভির স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি’র হাতে তুলে দেন, এই ওষুধ করোনাভাইরাস নিরাময়ে সহায়তা করে। এই ওষুধ মিয়ানমারের করোনাভাইরাস আক্রান্ত নাগরিকদের চিকিত্সায় সহায়তা করবে। পররাষ্ট্রসচিব কোভিড -১৯ এর টিকা উপলব্ধ হলে তা ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে মিয়ানমারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের দ্রুত নিজ নিজ দেশে ফেরার জন্য উভয়দেশকে আর্থিক ও মানবিক সহায়তা প্রধান করেছে।
ভারত ও মিয়ানমার সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তাদের জ্বালানি সম্পর্কও আরো জোরদার করেছে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মিয়ানমারে ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের সফরের সময়, দু’পক্ষ পেট্রোলিয়াম পণ্য ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য একটি সমঝোতা স্বারক পত্রে স্বাক্ষর করে। দু’দেশের জ্বালানী ক্ষেত্রে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা রয়েছে। এর সর্বশেষ বৈঠক চলতি বছরের জুন মাসে অনুষ্ঠিত হয়। ভারতের মিজোরাম রাজ্য এবং মিয়ানমারের মধ্যে সীমান্ত বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য, ভারত মিয়ানমারের চিন প্রদেশের সারসিচাউকে সীমান্ত “হাট” সেতু নির্মাণের জন্য ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদানের ঘোষণা করেছে, এর ফলে অর্থনৈতিক সংযোগ বৃদ্ধি পাবে। ২০১৬ সালের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্থ বিশ্বখ্যাত বাগান প্যাগোডাসের মতো মিয়ানমারের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণেও ভারত সহায়তা প্রদানের কথা ঘোষণা করেছে। (মূল রচনাঃ রঞ্জিত কুমার)