QUAD ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে সহায়ক

For Sharing

জাপানে QUAD বিদেশ মন্ত্রী পর্যায়ের দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হল। টোকিওতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডঃ এস জয়শঙ্কর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশ মন্ত্রী মাইক পম্পেও, অস্ট্রেলিয়ার বিদেশ মন্ত্রী মারিসে পেইনে এবং জাপানের বিদেশমন্ত্রী মতেগেই তোশিমিতসুর মধ্যে বৈঠক হয়। আন্তর্জাতিক স্তরে কোভিড-১৯ পরবর্তী বিশ্বে চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগের বিষয়ে আলোচনার জন্য QUAD বিদেশ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে যোগ দেন। চলতি অতিমারির ফলে অনিশ্চিত বিশ্ব অর্থনীতি, মার্কিন-চীন প্রতিযোগিতা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির কৌশলগত প্রেক্ষাপটে এই বৈঠকটির গুরুত্ব রয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রাষ্ট্রসংঘ সাধারণ সভার সম্মেলনের পাশাপাশি ভারত-অস্ট্রেলিয়া-জাপান-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে গঠিত QUAD-এর বিদেশ মন্ত্রী পর্যায়ের প্রথম বৈঠকটির আয়োজন করা হয়েছিল। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবাধ প্রবেশ এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল।
টোকিওয় বিদেশ মন্ত্রী পর্যায়ের এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল, করোনা পরবর্তী পরিস্থিতিতে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জগুলির মোকাবিলায় – সাশ্রয়ী মূল্যের ভ্যাকসিন তৈরি করা এবং একদিকে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই এবং বিশ্বজুড়ে মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকটের মোকাবিলা এবং অন্যদিকে আর্থিক সমস্যা দেখা দেওয়ার জন্য একে অপরের সেরা অনুশীলনগুলি ভাগ করে নেবার ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত প্রয়াস গড়ে তোলা।
আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, নেভিগেশনের স্বাধীনতা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিরোধ নিষ্পত্তির শান্তিপূর্ণ সমাধান এই বৈঠকের প্রধান বিষয়। অবাধ, মুক্ত এবং সার্বিক ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং ঐ অঞ্চলে কৌশলগত স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে আসিয়ান-কেন্দ্রিক এবং আসিয়ান-ভিত্তিক আঞ্চলিক পরিকাঠামোই প্রধান ভূমিকা পালন করতে পারে।
QUAD দেশগোষ্ঠীর মধ্যে গভীর কৌশলগত সমন্বয় রয়েছে। সেনা সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমেই নিরাপত্তা সহযোগিতা মজবুত হয়। তাছাড়া, যৌথ অনুশীলনের মাধ্যমে নৌবাহিনীর মধ্যে আন্তঃ সহযোগিতা আরও জোরদার হয়েছে। সুরক্ষিত, নিরাপদ এবং স্থিতিশীল সমুদ্র অঞ্চলে ভারতের ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় উদ্যোগ এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২+২ মন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনা এবং কৌশলগত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় ত্রিপাক্ষিক বৈঠকও QUAD-এর পরিপূরক।
কোভিড অতিমারি এবং বিশ্ব অর্থনীতি ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থায় গৃহীত পদক্ষেপের পর, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানো প্রয়োজন। সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত অর্থনীতির ক্ষেত্রে এক বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং সরবরাহকারী চেইনের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করা শীর্ষস্থানীয় অগ্রাধিকার। এই বিষয়ে QUAD-এর কয়েকটি সদস্য দেশ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিশ্বাসযোগ্য, নির্ভরশীল সাপ্লাই চেন গড়ে তোলার লক্ষ্যে অস্ট্রেলিয়া-ভারত-জাপান সাপ্লাই চেন উদ্যোগ গড়ে উঠেছে।
অবাধ এবং মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল গড়ে তুলতে উন্নত মানের পরিকাঠামো ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গঠন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রসঙ্গে কোয়াড দেশগুলি স্বচ্ছ ও দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক সুরক্ষা সহ বিশ্বব্যাপী সেরা অনুশীলন গ্রহণ এবং প্রশাসনের সর্বোচ্চ মান বজায় রাখতে সহায়তা করছে। এছাড়াও সাইবার সুরক্ষা, সমুদ্র নিরাপত্তা, সন্ত্রাস মোকাবিলা সহ আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় নিয়েও এই বৈঠকে আলোচনা করা হয়েছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিঞ্জো আবের পদত্যাগের পর নতুন প্রধানমন্ত্রী ইউশিহিরে সুগা দায়িত্বভার গ্রহণের পর বিদেশ মন্ত্রীদের এই বৈঠক। জাপানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আবেও QUAD গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। QUAD বৈঠকে বিদেশ মন্ত্রীগণ সার্বজনীন মূল্যবোধ এবং কৌশলগত স্বার্থের পারস্পরিকতার ভিত্তিতে সম-মানসিক দেশগুলিকে একত্রিত করার জন্য শিঞ্জো আবের প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নেওয়ার প্রতি আস্থা ব্যক্ত করেছেন।
QUAD বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডঃ এস জয়শঙ্কর তাঁর ভাষণে বলেছেন, প্রাণবন্ত গণতন্ত্র এবং অভিন্ন মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত QUADভুক্ত চারটি দেশ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলকে সব দেশের জন্য অবাধ ও উন্মুক্ত রাখার জন্য একযোগে কাজ করে যাবে।
টোকিওতে গতকাল QUAD মন্ত্রী পর্যায়ের দ্বিতীয় বৈঠকে সদস্য দেশগুলি সুনির্দিষ্ট নিয়মবিধির উপর প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, কাজকর্মে স্বচ্ছতা, আঞ্চলিক অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং এই অঞ্চলে যাবতীয় বিতর্কের শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে একযোগে কাজ করে যেতে তাদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। ডঃ এস জয় শঙ্কর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার বিদেশ মন্ত্রীদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। জাপান, ভারতের ‘পূবে সক্রিয়’ নীতির গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। প্রধানমন্ত্রী সুগা দায়িত্বভার গ্রহণের পর ভারত-জাপান বিশেষ কৌশলগত এবং বিশ্ব অংশীদারিত্বে গতি আসবে বলেই ভারতের আশা। (মূল রচনাঃ তিতলি বসু )