সমুদ্র ক্ষেত্রে চীন-পাকিস্তান বন্ধন  : এক অসম ও অনিশ্চিত সম্পর্ক

For Sharing

ভারত মহাসাগর অঞ্চলে ‘ক্ষমতার ভারসাম্য’ বজায় রাখার জন্য পাকিস্তানের “কৌশল প্রণয়নকারীরা” পাকিস্তান নৌবাহিনী ও গ্বাদর বন্দরের উন্নয়নকে সগর্বে প্রয়োজনীয় বলে তুলে ধরছে। এই অঞ্চলে চীনা নৌ-শক্তির দখলদারী এবং ভারত মহাসাগরে চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উচ্চাশাকে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তান নৌবাহিনীর ভূমিকার ন্যায্যতা প্রতিপাদনের জন্য অসংখ্য বিভ্রান্তিমূলক যুক্তি সামনে আনা হচ্ছে।

এই দাবিগুলি যে আদতে ত্রুটিযুক্ত এবং সেগুলি যে অন্তঃসারশূন্য তা তুলে ধরতে যথাযথ ঐতিহাসিক, ভূ-রাজনৈতিক এবং সমসাময়িক প্রসঙ্গ উত্থাপনের মাধ্যমে বিচার করার প্রয়োজন রয়েছে। পাকিস্তান নৌবাহিনীর ভবিষ্যতের ভূমিকার অস্তিত্বের ভিত্তিটি হ’ল ভারত মহাসাগরের ‘চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমীকরণ। চীনের সংশোধনবাদ এবং প্রতিশোধপরায়ণ নীতি নিয়ে উদ্বেগ এখন প্রায় সর্বজনীন। সুতরাং, ভারতের মতো সামুদ্রিক শক্তি এবং চীনের মতো সম্প্রসারণবাদীর মধ্যে ভারত মহাসাগরে শক্তি প্রতিযোগিতা নতুন বা অপ্রত্যাশিত নয়।

 পাকিস্তানের, ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিরুপতা এবং চীনের প্রতি ঝুঁকে থাকা,আদতে অপেক্ষাকৃত বৃহৎ একটি শক্তির কাছে ‘ভাড়াটে সেবা প্রদানকারী’ হিসাবে দেশকে তুলে ধরার পাকিস্তানী মানসিকতারই প্রকাশ।  এই প্রবণতাটি ভারত উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক উত্তর ইতিহাস জুড়ে দেখা গিয়েছে।  

এই ইতিহাসটি স্মরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। চীনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহায়তায় অতি উৎসাহী হয়ে ওঠার ফলস্বরূপ আজ পাকিস্তান নিজেকে বালুচিস্তানের এক ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সংকটের মুখে ফেলছে।  পাকিস্তানের অশান্ত অঞ্চলে অবস্থিত গ্বাদর বন্দর, এই অঞ্চলে ভারতের সামুদ্রিক পুনরূত্থানকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পাকিস্তানের বিভিন্ন বিকল্পের খোঁজের ক্ষেত্রে ‘গেম চেঞ্জার’ হিসাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বাণিজ্যিক ও সামরিক বন্দর হিসাবে গ্বাদরের বিকাশ, বিভিন্ন উপায়ে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ এবং আঞ্চলিক নীতিক্ষেত্রে যে  ভুলগুলি হয়ে চলেছে তার স্পষ্ট প্রকাশ।

স্বল্পমেয়াদী লাভের আশায় স্থানীয় জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে অবজ্ঞা করার এবং পরিবর্তে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সেনাবাহিনীর মুখ্যতা বজায় রাখার জন্য বাহ্যিক কৌশলগত অনুগ্রহকারীকে সন্তুষ্ট করাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে রাওয়ালপিন্ডি তার চিরাচরিত ঐতিহাসিক প্রবণতা প্রদর্শন করছে। কিন্তু, উদাহরণ হিসেবে জিবুতির কথা তুলে ধরা যেতে পারে, যেখানে চীন ধীরে ধীরে সাড়ম্বরে একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্রকে পুরোপুরি উন্নত সামরিক ঘাঁটিতে রূপান্তরিত করেছে, সেখানে পাকিস্তানের গ্বাদরে আসলে কি হতে চলেছে তা স্পষ্ট নয়।  

পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে সম্পর্ক যে তথাকথিত ‘হিমালয়ের চেয়েও বিশাল ও সমুদ্রের থেকেও গভীর’, গ্বাদর প্রসঙ্গে এখন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।

বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে গ্বাদরকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে  সেদেশে বিনিয়োগে চীনকে প্রলুব্ধ করা আসলে ইসলামাবাদের পক্ষে কৌশলগত অদূরদর্শিতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।  পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর মাধ্যমে নেতাকর্মীদের নিখোঁজ করে দেওয়া ও তাদের বেছে বেছে  হত্যার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত, দমনকারী সামরিক বাহিনীর অত্যাচার কাটিয়ে উঠে ন্যায়সঙ্গত ভবিতব্য নিরূপনের লক্ষ্যে বালুচিস্তানের জনগণের লড়াইকে কোনও চিত্তাকর্ষক এবং আধুনিক নির্মাণ স্তব্ধ করে দিতে পারবে না।

গ্বাদরে চীনের সামরিক উপস্থিতি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের শক্তিগুলিকে উত্তর ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে তাদের সামরিক সুবিধার ক্ষেত্রে এক বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করবে। সুতরাং, অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটেই হোক বা বাহ্যিকভাবেই হোক, আপাত-চীনা ঘাঁটি হিসাবে গ্বাদরের বিকাশ পাকিস্তানকে একটি জটিল কৌশলগত পরিস্থিতির মধ্যে ফেলতে বাধ্য।

সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করে এমন নীতিগুলির কারণে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুবই খারাপ। সৌদি আরবের কাছ থেকে সাম্প্রতিক অপ্রত্যাশিত প্রত্যাখ্যানটি পাকিস্তানের নেতারা যেপথে চলেছেন সে বিষয়ে ইসলামাবাদকে সতর্ক করে দেওয়ার ইঙ্গিত যা ঐস্লামিক কাউন্সিলের সংগঠনে পাকিস্তানের অবস্থানকেই নাড়িয়ে দিয়েছে।

সাধারণ জনগণের জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে উন্নয়নমূলক ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা না ভেবে,  পাকিস্তান সামরিক বাহিনী তার উচ্চ মূলধন ও রাজস্ব ব্যয়  বজায় রেখে চলেছে এবং তাদের অধিকাংশ হার্ডওয়্যার চীন থেকেই আমদানি করছে। ইউরোপ এবং চীনে ব্যয়বহুল হার্ডওয়্যার কেনার চেষ্টা করে চলা পাকিস্তান নৌবাহিনী  অপব্যয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সমুদ্রক্ষেত্রে ভারতের পুনরুত্থান সম্পর্কে পাকিস্তানের সামুদ্রিক কৌশলবিদগণের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে। ভারত মহাসাগর অঞ্চলের জন্য ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং অনুষঙ্গী যা ভারতের ‘সাগর’ (সমস্ত অঞ্চলের সবার জন্য সুরক্ষা ও বিকাশ) নীতিতে প্রতিফলিত হয়েছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং অভিন্ন সুবিধা প্রাপ্তির ধারণায় প্রোথিত উপকূলীয় অঞ্চলের দেশগুলির সঙ্গে সমানাধিকারের ভিত্তিতে পছন্দের সুরক্ষার অংশীদার হিসাবে আত্মপ্রকাশই ভারতের ইচ্ছা।   ভারতের নীতিগুলি  চীনের মতো  নিষ্কর্ষী বা  শোষণমূলক নয়। ‘নেট সিকিউরিটি প্রোভাইডার’ বা সম্পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদানকারী পরিভাষাটি ভারতের দেওয়া নয় এবং  ভারত প্রসঙ্গে পেশাদার বিশ্ব পর্যবেক্ষকরা এই পরিভাষা ব্যবহার করেছেন।

চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কৌশলগত সংযোজন হিসাবে চীনের হাতে নিজেদের দেশকে শোষণের সুযোগ না দিয়ে পাকিস্তানের বোঝা উচিত যে তাদের স্বার্থ নিহিত রয়েছে ভারত মহাসাগর অঞ্চলে একটি ন্যায্য এবং বিরোধিতাহীন জীবনযাত্রাপ্রণালী চাওয়ার মধ্যেই।

[মূল রচনা- সুমিত কুমার সিং]