মার্কিন উপ বিদেশমন্ত্রীর ভারত সফর

For Sharing

মার্কিন উপ বিদেশ মন্ত্রী স্টিফেন বেগান ১২’ ই অক্টোবর থেকে তিন দিনের ভারত সফর করে গেলেন। তাঁর এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল ভারত-মার্কিন সর্বাত্মক বিশ্ব কৌশলগত অংশীদারিত্বকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং দুটি দেশ কিভাবে ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং সারা বিশ্বে শান্তি নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি সুনিশ্চিত কোরতে একযোগে কাজ করতে পারে সে ব্যাপারে আলাপ আলোচনা। ভারত সফরকালে মিস্টার বেগান ভারতের প্রবীণ সরকারি আধিকারিকদের সঙ্গে আলোচনা করলেন এবং ভারত-মার্কিন মঞ্চের সভায় মূল ভাষণ দিলেন। এই সফর আগামী তেশরা নভেম্বর মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে এ মাসের শেষের দিকে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের মধ্যে ২+২ বার্তালাপের ক্ষেত্র প্রস্তুত করল। উল্লেখ করা যেতে পারে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর ২+২ ফরম্যাটে আলোচনা প্রক্রিয়া শুরু হবার পর এটি হবে ভারত-মার্কিন তৃতীয় ২+২ বার্তালাপ। ২+২ বার্তালাপের আলোচ্যসূচিতে রয়েছে দুটি দেশের মধ্যে বুনিয়াদি বিষয়ে আলাপ-আলোচনা ও পারস্পরিক সহযোগিতা চুক্তি-BECA,যার আওতায় ভারতের সামরিক ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার উপগ্রহ এবং অন্যান্য সেনসর থেকে প্রাপ্ত তথ্য ভারতের সঙ্গে বিনিময় করবে। দুটি দেশের মধ্যে এটি ছিল চতুর্থ চুক্তি। এর আগে তিনটি এই ধরণের চুক্তি সাক্ষর করা হয়- ২০০২(সামরিক তথ্য বিনিময় সুরক্ষা),, ২০১৬( গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য বুনিয়াদি তথ্য সুরক্ষা) ও ২০১৮ (একটি নিরাপদ যোগাযোগ সংক্রান্ত) চুক্তি। পারস্পরিক অংশীদারিত্ব কেবল রাজনৈতিক স্তরে সীমিত না থেকে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতা স্তরে উন্নীত হয়েছে। দুটি দেশের মধ্যে সংবেদনশীল প্রযুক্তিগত তথ্য বিনিময় সহ বিভিন্ন বিষয়ে স্বাক্ষরিত চুক্তি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতা নির্দেশ করে। মার্কিন উপ বিদেশমন্ত্রীর এই ভারত সফরে দুটি দেশের মধ্যে আলোচনায় কোভিড-১৯ অতিমারী এবং এশিয়ার বিভিন্ন বিষয়ে চীনের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসন মূলক আচরণের বিষয়েও আলোচনা হবার কথা ছিল।
মার্কিন উপ বিদেশমন্ত্রীর সদ্য সম্পন্ন ভারত সফর আরেকটি দিক থেকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। টোকিওতে QUAD দেশ গোষ্ঠীর অধীন অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে বৈঠকের এক সপ্তাহ পরেই তিনি এই ভারত সফরে এলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সম্পর্ককে একটি আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়ে এই অঞ্চলে চীনা আগ্রাসনের একটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আগ্রহী। ভারত- প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবাধ নৌ চলাচলের অধিকার ও তার জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াও কোভিড-১৯ অতিমারী পরবর্তী পরিস্থিতিতে মার্কিন শিল্পজাত পণ্য রপ্তানির একটি বিকল্প সাপ্লাই চেন হিসেবে গড়ে তোলাও ওয়াশিংটনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্কে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রধানত তিনটি কারণ। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রসঙ্গ, ভারত- প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসন মূলক আচরণ, এবং করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চীনের সরকারি স্বাস্থ্য নীতির টালবাহানা ও এক প্রকার ঔদাসীন্য। দুটি দেশের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধ, ও সে কারণে চীনা পণ্যের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধিক নির্ভরতা কমিয়ে পরিবর্তে তার বিকল্প সাপ্লাই চেইন সন্ধান করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বাধ্য করেছে। এই পরিস্থিতির সঙ্গে ‘আত্মনির্ভর ভারত’ নীতি এবং ভারতকে একই সঙ্গে সারা বিশ্বের জন্য কারখানা জাত পণ্য যোগানের উৎ স স্থল হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। মার্কিন উপ বিদেশমন্ত্রীর ভারত সফরে ভারত ও চীনের মধ্যে সাম্প্রতিক সীমান্ত উত্তেজনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে ; এবং তা ২+২ বার্তালাপের বিষয়সূচিতেও রয়েছে। ভারত -চীন সীমান্ত উত্তেজনার সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হতে মার্কিন বিদেশমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী এসপার সব সময় ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়টিও মার্কিন উপ বিদেশ মন্ত্রীর এই ভারত সফরে আলোচ্যসূচির অন্যতম বিষয় ছিল। দুটি দেশ একটি অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও আদর্শের ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে একযোগে কাজ করছে।
বিশ্বব্যাপী করোনা সংক্রমণের বিষয়টিও স্টিফেন বেগানের ভারত সফরে আলোচ্য বিষয় সূচিতে প্রাধান্য পেয়েছে। করোনা অতিমারির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি ও কাজকর্মে পারস্পরিক সমন্বয় সাধনের লক্ষ্যে এবছরের মার্চ মাসেই ভারতের পররাষ্ট্র সচিব শ্রিংলা, মার্কিন উপ বিদেশ মন্ত্রী স্টিফেন বেগান এবং QUAD ভুক্ত অন্য দুটি দেশের বিদেশ মন্ত্রীদের মধ্যে সাপ্তাহিক টেলিফোন আলাপ আলোচনা শুরু হয়;এবং তাতে পরে যোগ দেয় ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশ। আর প্রধানত করোনা অতিমারির মোকাবিলার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পন্থা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনার জন্য স্টিফেন বেগানের ভারত সফরের পরেই বাংলাদেশ সফরে যাবার কথা। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত সেপ্টেম্বরে মালদ্বীপের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি সম্পাদনের পর ভারতের আর এক ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশকে তার উপ বিদেশমন্ত্রীর সফর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। স্টিফেন বেগানের বাংলাদেশ সফর দক্ষিণ এশিয়ার ছোট ছোট দেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি আলাপ-আলোচনার একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত করল। ভারত এই পারস্পরিক আলোচনার নীতিতে বিশ্বাসী এবং প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে একটি স্থিতিশীল শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাই ভারতের পররাষ্ট্র নীতির বুনিয়াদি আদর্শ। (মূল রচনা ডঃ স্তুতি ব্যানার্জি )