মানবাধিকার পরিষদে পাকিস্তানের পুনর্নিবাচন ও তার প্রভাব

For Sharing

রাষ্ট্র সঙ্ঘের মানবাধিকার পরিষদে পাকিস্তানের পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের ক্ষেত্রে এক দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে কেননা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মানবাধিকার গুরুতর চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। মানবাধিকার পরিষদের চারটি আসনের জন্য  এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পাঁচটি দেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল এবং এগুলির মধ্যে পাকিস্তান ১৯৩ সদস্যের রাষ্ট্র সঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের সর্বাধিক ১৬৯টি ভোট পেয়ে  নির্বাচিত হয়। 

উজবেকিস্তান পায় ১৬৪টি ভোট, নেপাল ১৫০ ও চীন ১৩৯টি ভোট পেয়ে পাকিস্তানের সঙ্গেই নির্বাচিত হয়। সর্বনিম্ন ৯০টি ভোট পেয়ে  সৌদি আরব এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরাজিত হয়। মানবাধিকার পরিষদের নিয়ম অনুযায়ী ভৌগলিক প্রতিনিধিত্ব সুনিশ্চিত করতে  বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য  আসনগুলি নির্দিষ্ট করা হয়। মানবাধিকার পরিষদের ৪৭ সদস্যের মধ্যে ১৫টি আসনের নির্বাচনের সর্বশেষ পর্বটি কম-বেশি আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল কেননা অন্য আঞ্চলিক সদস্যগুলি  বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে যায়। 

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রায়শই সমালোচনার সম্মুখীন পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার তথা অধিকারের পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে এই  চালটিকে দেখতে হবে। প্রথমত সংখ্যালঘু অধিকারের বিষয়টি পাকিস্তানের এক দুর্বলতম বিষয় কেননা সেদেশের হিন্দু, শিখ, খ্রিস্টানরা দীর্ঘদিন ধরেই অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন। ১৯৪৭-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরে পাকিস্তানে সংখ্যালঘুবিরোধী হিংসা কমেছিল, কিন্তু রাষ্ট্রপতি জিয়া উল হকের শাসনকালে পাকিস্তান কট্টর ঐস্লামিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করায় সংখ্যালঘুদের অধিকার লঙ্ঘন আবার করে শুরু হয়। এই ধরণের হিংসার সবথেকে ভয়ানক ঘটনাটি  ছিল ২০১১ সালে সংখ্যালঘু অধিকার বিষয়ক মন্ত্রী খ্রিস্টান শাহবাজ ভাট্টির হত্যা।

পাকিস্তানে  ধর্ম সংক্রান্ত উপাদান বৃদ্ধি পাওয়ায় বৃহত্তর সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির উদ্ভব হয় যা পাকিস্তানের অন্যতম বড় শহর করাচি সহ বিভিন্ন স্থানে শিয়া বিরোধী হিংসায় পর্যবসিত হয়। বিশিষ্ট শিয়াপন্থীদের অপহরণ ও হত্যার সাম্প্রতিকতম ঘটনা আবারও পাকিস্তানের মানবাধিকার ক্ষেত্রের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। 

পাকিস্তান যেভাবে বালুচিস্তান মুক্তি আন্দোলন ও আজাদ কাশ্মীর অঞ্চলের কর্মীদের মোকাবিলা করছে তা ব্যাপকভাবে নিন্দিত হয়েছে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর হাতে বালুচিস্তানের নেতা-কর্মীদের প্রায়শই অকথ্য বর্বরতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। বালুচিস্তানের প্রতিনিধিরা সম্প্রতি জেনেভা সফর করেন এবং  স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের জন্য গণ-আন্দোলনের সাক্ষী সেই অঞ্চলের মানবাধিকার পরিস্থিতির ভয়ানক রূপ  তুলে ধরেন।   

পাকিস্তানে ঘটে চলা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাবলী এবং সেদেশের ওপর আন্তর্জাতিক শাস্তি আরোপের আশঙ্কা থাকায় রাষ্ট্র সঙ্ঘ মানবাধিকার পরিষদের সদস্য হয়ে থাকা তাদের জন্য খুবই যুক্তি সঙ্গত কারণ। ফলে এটা সহজেই বোধগম্য যে মানবাধিকারের বিষয়ে সমালোচিত পাকিস্তান ও চীন উভয় দেশেরই মানবাধিকার পরিষদে উপস্থিতি  সুনিশ্চিত করতে  ব্যাপক কূটনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগের কারণ ছিল। একারণে, পাকিস্তানের দুর্বলতম বিষয় হয়ে ওঠা  মানবাধিকারের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এই ভোটকে দেখা উচিত বিশেষ করে  যখন তারা এই বিষয়ে অন্যের দিকে আঙুল তোলে। সাম্প্রতিক সময়ে কাশ্মীর প্রসঙ্গে পাকিস্তানের সমালোচনার মোকাবিলায় ভারত, পাকিস্তানের হিন্দু ও শিখ সংখ্যালঘুদের ওপরে সেদেশের আচরণের উল্লেখ করেছে।

তাই এটি বুঝতে হবে যে শুধু ভারত ও আফগানিস্তানের মতো দেশের দিকে আঙুল তোলার জন্যই নয় বরং তাদের এই কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রয়াস আদতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থায় তার উপস্থিতিকে সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে যাতে তারা সেদেশের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকারের বিষয়ে  কোনও সমালোচনাকে প্রতিরোধ  করতে পারে।

তবে  পাকিস্তানের মতো অন্যতম অধিকার লঙ্ঘনকারীদের দখলে মানাবাধিকার  পরিষদ চলে গেলে সেই সংস্থার  ভবিষ্যতই এক বড় প্রশ্ন চিহ্নের সামনে চলে আসবে। যে সব দেশ তাদের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলিকে শুধরে নিচ্ছে না এবং সেটিকে বিশ্ব শক্তির রাজনীতির অঙ্গ হিসেবে দেখছে তাদের ওপর বিশেষভাবে মনোনিবেশের মাধ্যমেই এই  সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে। এই ধরণের মনোভাব মানবাধিকার পরিষদকে যথাযথভাবে কাজ করতে দেবে না এবং এক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

[মূল রচনা- কল্লোল ভট্টাচার্য]