জেনারেল নারাভানের নেপাল সফরঃ ভারত-নেপাল সম্পর্কের অগ্রগতিতে একটি মাইফলক 

For Sharing

সেনা প্রধান জেনারেল মনোজ মুকুন্দ নারভানের সদ্য সমাপ্ত তিন দিনের নেপাল সফর, ভারত ও নেপালের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক প্রথারই রূপায়ন বলে মনে করা হলেও বিভিন্ন দিক থেকে এই সফর বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। গত এক  বছরেরও বেশী সময় ধরে দু’দেশের মধ্যে সম্পর্কের ক্রমঅবনতির পর, এটি  ভারতের দিক থেকে কাঠমান্ডুতে প্রথম উচ্চ পর্যায়ের সফর। ঐতিহ্য অনুসারেই নেপালের প্রধানমন্ত্রী তথা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলির উপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারী জেনারেল নারাভানেকে নেপাল সেনাবাহিনীর সাম্মানিক জেনারেল হিসেবে সম্মানিত করেন। উল্লেখ্য, সম্প্রতি নেপালের উপ-প্রধানমন্ত্রী ঈশ্বর পোখরেলকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেওয়ার পর শ্রী ওলি ঐ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। নেপালে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত বিনয় ক্ষত্র, নেপালের সেনা প্রধান পূর্ণ চন্দ্র থাপা এবং উভয় দেশের শীর্ষ আধিকারিকরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, ১৯৫২ সাল থেকে ভারত এবং নেপালের মধ্যে একে অপরের সেনা প্রধানকে এই সম্মান জ্ঞাপনের ঐতিহ্য রয়েছে।  নেপালের সেনা প্রধান থাপাকে ২০১৯এর জানুয়ারীতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাম্মানিক জেনারেল সম্মান প্রদান করা হয়েছিল।        

প্রায় ১৮০০ কিলোমিটার বিস্তৃত সীমান্ত বিশিষ্ট দুই নিকট প্রতিবেশী দেশ ভারত  এবং নেপালের কাছে পারস্পরিক সখ্যতা এবং একে অপরের সুরক্ষার বিষয়টি গভীরভাবে বোঝার জন্য এটি একটি বড় উপলক্ষ্য ছিল। পারস্পরিক ভৌগলিক ও  ভূ-রাজনৈতিক নৈকট্যের প্রেক্ষিতে উভয় দেশ সামরিক সম্পর্ক ছাড়াও শতাব্দী প্রাচীন ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে জোরদার করার প্রয়াস নিয়েছে। ভারত, নেপালের সেনাকর্মীদের প্রশিক্ষণ ও সাজসরঞ্জাম সরবরাহের মাধ্যমে নেপালের সেনাবাহিনীর আধুনিকীকরণে সহযোগিতা করে। দুই দেশের সেনাবাহিনীও পর্যায়ক্রমে যৌথ সামরিক মহড়ার আয়োজন করে থাকে।   

ভারতের সেনাপ্রধানের এই সফর বহুদিন পরে নেপালে একটি উচ্চ পর্যায়ের সফর ছাড়াও তা উভয় দেশকে পারস্পরিক উদ্বেগকে আরও ভাল করে বোঝার সুযোগ দিয়েছে। খবরে প্রকাশ, প্রধানমন্ত্রী ওলি জেনারেল নারাভানেকে বলেন,  দুই দেশের মধ্যে যে কোনও ধরণের ভুল বোঝাবুঝির আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে। তাঁর বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা পরে জানান,  নেপাল কালাপানি বিতর্কের সমাধানে আগ্রহী এবং এই বৈঠকে তার সমাধানের প্রয়াস নেওয়া হবে।  

প্রকৃতপক্ষে, ভারত নেপাল সম্পর্কের মধ্যে যে শীতলতা ছিল তা অনেকাংশেই হ্রাস পায় যখন নেপালের প্রধানমন্ত্রী ওলি ভারতের স্বাধীনতা দিবসে এবং রাষ্ট্রসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হিসাবে ভারতের নির্বাচনের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অভিনন্দন জানান। 

উল্লেখ্য, নেপাল, ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের লিম্পিয়াধুরা এবং কালাপানি অঞ্চল সহ নেপালের একটি সংশোধিত আঞ্চলিক মানচিত্র প্রকাশের পর ভারত ও নেপালের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়। নেপাল সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলিকে তাদের সার্বভৌম অঞ্চল হিসাবে দাবি করে। গত মে মাসে, উত্তরাখণ্ডের ধরচুলা থেকে ভারত, নেপাল এবং চীনের অধীন তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল যেখানে মিলিত হয়েছে তার নিকটবর্তী লিপুলেখ গিরিবর্ত পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়ক উদ্বোধনের বিষয়ে ভারতের সিদ্ধান্তে নেপাল আপত্তি জানায়। নেপাল এর সমাধানের জন্য অবিলম্বে পররাষ্ট্র সচিব স্তরের আলোচনার দাবি জানায় তবে উভয় দেশেই কোভিড -১৯ অতিমারী বাড়তে থাকায় পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত ভারত আলোচনা স্থগিত রাখে। 

নেপালের ওলি সরকার দেশের একটি সংশোধিত মানচিত্র প্রকাশ করেছে, যাতে প্রায় ৩৩৫ বর্গকিলোমিটার ব্যাপী লিপুলেখ, লিম্পিয়াধুরা এবং কালাপানি অঞ্চলকে নেপালের অন্তর্ভূক্ত বলে দেখানো হয় এবং সেদেশের সংসদ ঐ মানচিত্রটি অনুমোদন করে। বিদ্যালয়ের পাঠক্রমেও এই নতুন মানচিত্র অন্তর্ভূক্ত করা হয়। ভারত এ ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে নেপালকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়ে সীমান্ত সংক্রান্ত বিতর্কের সমাধানের জন্য ইতিবাচক  আলোচনার পরিবেশ তৈরির কথা বলে। পরিস্থিতি অনুকূল করার লক্ষ্যে নেপাল  বিদ্যালয়ের পাঠক্রম থেকে ঐ নতুন আঞ্চলিক মানচিত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছে।  

কৌশলগত বিশ্লেষক ও নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য উদ্ধৃত ক’রে বলা হয়েছে, জেনারেল নারাভানের সফরের পাশাপাশি নেপাল সরকারের গৃহীত সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলি, এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনা পুনরায়  শুরু করার জন্য পারস্পরিক আস্থা তৈরিতে সহায়ক হবে।     

(মূল রচনা: রতন সালদি)