পররাষ্ট্র সচিবের মালদ্বীপ সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মজবুত করবে

For Sharing

ভারতের পররাষ্ট্রসচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা মালদ্বীপের বিদেশ সচিব আবদুল গফফর মোহাম্মদ’এর আমন্ত্রণে সে দেশে সরকারি সফর সম্পন্ন করলেন। করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে দুটি দেশের উচ্চ সরকারী প্রতিনিধিদের মধ্যে এটাই ছিল প্রথম সামনাসামনি সাক্ষাৎকার। এই সফরে পররাষ্ট্রসচিব মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম মোহাম্মদ সোলিহ’র সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করলেন। এই সফরে তিনি মালদ্বীপের বিদেশমন্ত্রী ছাড়াও প্রতিরক্ষা, অর্থ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পরিকল্পনা, স্বরাষ্ট্র, পর্যটন এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রীদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করলেন। শ্রী শ্রিংলা এই সফরে মালদ্বীপ সংসদের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ নাসিদ’এর সঙ্গেও আলোচনা করলেন। দুটি দেশের মধ্যে ক্রীড়া ও যুব বিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারকপত্র স্বাক্ষরিত হলো। এছাড়া সমষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প এবং গ্রেটার মালে অঞ্চলের সংযোগ প্রকল্প গুলির অর্থ সহায়তার জন্য ভারতের পক্ষ থেকে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি মঞ্জুরি সহায়তাও স্বাক্ষরিত হলো। মালদ্বীপের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা শিশু উদ্যানের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণও পররাষ্ট্র সচিবের এই সফরে মালদ্বীপ সরকারকে প্রদান করা হলো। পররাষ্ট্রসচিব শ্রী শ্রিংলা ভারতের অর্থসহায়তায় মালদ্বীপে ২০১৯’এর ডিসেম্বর থেকে যেসব প্রকল্প রূপায়ণ হচ্ছে সেগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করলেন। ২০১৮ সালের নভেম্বরে রাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম সলিহ মালদ্বীপে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারত-মালদ্বীপ সম্পর্কে ক্রমাগত উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ভারত ও মালদ্বীপের মধ্যে সম্পর্ক গত দু’বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে যেমন অর্থনৈতিক বিকাশ, পরিকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা, ক্রীড়া, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মজবুত হচ্ছে। ভারত, গ্রেটার মালে প্রকল্পের জন্য অতিরিক্ত ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়াও ১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আর্থিক সুবিধা গুচ্ছ মালদ্বীপের জন্য বরাদ্দ করেছে। দুটি দেশের মধ্যে covid-19 জনিত পরিস্থিতির মোকাবিলায় পারস্পরিক সহায়তা ঘনিষ্ঠ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আরেকটি পরিচয় বহন করছে। মালদ্বীপ হল বিশ্বের প্রথম দেশ যে covid-19 মোকাবিলার জন্য ভারতের কাছ থেকে সর্বাধিক সহায়তা পেয়েছে। মালদ্বীপের মানুষ লকডাউন চলাকালে ভারতে এসে স্বাস্থ্যবিষয়ক সহায়তা পেতে পারবেন। ‘এয়ার বাবল’ চুক্তির আওতায় দুটি দেশের মধ্যে বিমান চলাচল বিষয়ক সিদ্ধান্ত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক, ১৯৬৫ সালে মালদ্বীপ স্বাধীনতা লাভ করার পর থেকে দেশটি ভারতের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ১৯৮৮ সালে মালদ্বীপে একটি অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা ভারতের সময়মতো সামরিক সহায়তায় ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো বেশি মজুবুত হয়েছে। এমনকি মালদ্বীপে একক রাজনৈতিক দল ব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় ব্যবস্থায় রূপান্তরের সময় এবং ২০০৮ সালে বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের আওতায় প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর থেকে পারস্পরিক বন্ধুত্ব এবং পারস্পরিক সমঝোতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। একমাত্র ২০১৩ সালে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ ওয়াহিদ হাসানের এবং রাষ্ট্রপতি আবদুল্লাহ ইয়ামেনের সময় ভারত-মালদ্বীপ সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল।

রাষ্ট্রপতি সোলিহ’র অধীনের প্রশাসন ‘ভারত প্রথম’ নীতি অনুসরণ করছে। সেজন্যই ভারত তার ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির আওতায় মালদ্বীপকে একটি বিশেষ স্থান দিয়ে থাকে। ২০১৯ থেকে মালদ্বীপের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান যোগাযোগ চীনকে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে নয়; বরং তা দক্ষিণ এশিয়ার দুটি প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং স্থায়ী সম্পর্ককে আরও মজবুত করারই বিশেষ প্রচেষ্টা। সোলিহ প্রশাসন ভারতের বিরুদ্ধে সে দেশে কিছু কিছু মহলের অপপ্রচার অগ্রাহ্য করে ভারতবিরোধী মনোভাবকে পরাস্ত করতে আন্তরিকভাবে আগ্রহী। মালদ্বীপের সাধারণ মানুষও ভারতবিরোধী বা ভারতের প্রতি বিদ্বেষ মনোভাব পোষণ করে না। মালদ্বীপকে ভারতের অর্থ সহায়তা ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের দেশগুলিতে ভারতের আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে নয় বরং পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করার উজ্জ্বল উদাহরণ। দুটি দেশের মধ্যে নৌ যাত্রী পরিষেবার সূচনা এবং ভারতের সহায়তায় সমুদ্র বিমান পরিষেবার সূচনা ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আর একটি উদাহরণ। দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ ছাড়াও ভারত আন্তর্জাতিক বহুপাক্ষিক মঞ্চে মালদ্বীপকে বিভিন্ন বিষয়ে সমর্থন করেছে। উদাহরণ হিসেবে ২০২১ সালে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ সভার ৭৬ তম অধিবেশনে পৌরোহিত্য কোরতে মালদ্বীপের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল্লাহ সাহিদের প্রার্থীপদকে ভারত সমর্থন জানাচ্ছে।

ভারত ও মালদ্বীপ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করায় দুটি দেশের মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক এক ইতিবাচক মোড় নিয়েছে। দুটি দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ সরকারি স্তরে নিয়মিত যোগাযোগ দ্বিপাক্ষিক চুক্তিবদ্ধ প্রকল্পগুলির নির্বিঘ্ন ও দ্রুত রূপায়ণের সহায়ক হবে। ( মূল রচনাঃ- ডক্টর গুলবিন সুলতানা)