ভারত ও পূর্ব এশিয়া শিখর সম্মেলন

For Sharing

২০২০ সালে পূর্ব-এশিয়া শিখর সম্মেলন- EAS’এর ১৫ বছর পূর্তি হলো। এই সম্মেলন আশিয়ান দেশগুলি ভিত্তিক একটি আঞ্চলিক জোটের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন। গত শনিবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এতে অংশ নিলেন। ভারতের পূবে তাকাও ও পূবে সক্রিয় হও- নীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের উপস্থিতি আরো বাড়াতে তিনি তাঁর ভাষণে আঞ্চলিক সহযোগিতার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভারতের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এছাড়া, আসিয়ানের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল দৃষ্টিভঙ্গি ও ভারতের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল দৃষ্টিভঙ্গি-এই দুটির মধ্যে সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম বিধি ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গুরুত্বের কথা বলেন। তিনি বলেন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক আইন, আঞ্চলিক অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্বের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। এই EAS সম্মেলনে হ্যানয় ঘোষণাপত্র গ্রহণ করা হয়। এছাড়া অবাধ নৌ চলাচল, ফলপ্রসূ কোভিড নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা, মহিলা বিষয়, শান্তি, স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক অর্থব্যবস্থার উন্নতির বিষয়ে কাজ করে যাবার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।
২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত EAS সংস্থার সদস্য দেশ গুলি হল আসিয়ান ভুক্ত দেশ ছাড়াও ভারত, চীন, জাপান, কোরিয়া প্রজাতন্ত্র, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। উল্লেখ করা যেতে পারে সেই নব্বই’এর দশকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী EAS গঠনের ধারণাটি ব্যক্ত করেছিলেন। পরে ২০০৫ সালে আসিয়ান মন্ত্রিসভার বৈঠকে অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও নিউজিল্যান্ডের অংশগ্রহণের কথা বলা হয়। পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া এতে যোগদান করে। ২০১১ সালে বালিতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ই এস এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে ভারত অভিন্ন স্বার্থ জড়িত বিভিন্ন কৌশলগত বিষয়ে সহযোগিতা বৃদ্ধির অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। এ বছরে এই সম্মেলনের প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল করোনা পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি সংঘবদ্ধ ও সুনিয়ন্ত্রিত প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনার বিকাশ,যার মধ্যে আছে ন্যায্য দামে করোনা প্রতিষেধক টিকা এবং এই অতিমারীর মোকাবিলায় প্রতিটি দেশের যে নিজস্ব সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবস্থাপনা রয়েছে তা অন্যান্য দেশের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া।
আঞ্চলিক সংযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা EAS’এর একটি অগ্রাধিকার প্রাপ্ত বিষয়। সমুদ্র অঞ্চলকে অবাধ ও উন্মুক্ত রাখা এবং একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম বিধি ভিত্তিক সমুদ্র ব্যবস্থা বজায় রাখা অভিন্ন দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। ভারত সমুদ্র নিরাপত্তা ও সহযোগিতা বিষয়ক প্রথম সম্মেলনের আয়োজন করে নতুন দিল্লিতে ২০১৫ সালে। পরে ২০১৬ সালে গোয়ায় এর দ্বিতীয় সম্মেলন হয় এবং তৃতীয় সম্মেলন হয় ২০১৮ সালে ভুবনেশ্বরে। এ বছরের প্রথম দিকে ফেব্রুয়ারি মাসে ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে একযোগে চেন্নাইয়ে সমুদ্র নিরাপত্তা সহযোগিতা বিষয়ক চতুর্থ EAS সম্মেলনের আয়োজন করে।
ভারত, আসিয়ান ও আসিয়ান নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন মঞ্চের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একটি বহুমুখী সম্পর্ক গড়ে তোলার নীতি অনুসরণ করে। এর আগে নভেম্বরের ১২ তারিখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভার্চুয়াল মোডে সপ্তদশ -তম আসিয়ান সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। বাণিজ্য, সংযোগ ও সংস্কৃতি এই তিনটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তিতে ভারত এই অঞ্চলে কৌশলগত যোগাযোগ গড়ে তোলায় আস্থাশীল। এছাড়াও আশিয়ান-ভারত কৌশলগত অংশীদারিত্বকে এক নতুন মাত্রা দিতে ভারত, আশিয়ান দেশগুলিতে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখবে। ভারত ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে সাংস্কৃতিক সম্পর্কের যে সুপ্রাচীন ইতিহাস বিদ্যমান; তা এই সম্মেলনে আন্তরিকভাবে স্বীকার করা হয়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে আঞ্চলিক সংযোগ, যেমন ভৌগোলিক, প্রতিষ্ঠানগত ও জন সম্পর্ক বৃদ্ধি ভারতের পক্ষে একটি কৌশলগত অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়। এছাড়া আশিয়ান দেশগুলি ভারতের চতুর্থ সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার দেশ; এই বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৯০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভারত আঞ্চলিক সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি-RCEP থেকে বেরিয়ে গেলেও আশিয়ান দেশগুলির সঙ্গে পণ্য বাণিজ্য চুক্তি পর্যালোচনার মাধ্যমে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করতে গভীরভাবে আগ্রহী।
আশিয়ান দেশগুলির সঙ্গে ভারত তার রাজনৈতিক, প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সহযোগিতা ক্রমাগত বৃদ্ধি করে যাচ্ছে। সেই সূত্রে EAS’এর মত সম্মেলন আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা মজবুত করার ক্ষেত্রে ভারতের কাছে এক নতুন সুযোগ এনে দেবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। (মূল রচনাঃ- ডক্টর তিতলি বসু)