কোভিড পরিস্থিতিতে ইসরোর কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ 

For Sharing

বর্তমান কোভিড ১৯ অতিমারী পরিস্থিতির মধ্যেই ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা – ইসরো বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত শ্রীহারিকোটা দ্বীপের সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার থেকে সম্প্রতি ২০২০ সালের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ সফলভাবে উৎক্ষেপণ করেছে। ঐ দিন পৃথিবী পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ ইওএস – ০১’এর  পাশাপাশি, তিনটি দেশের ৯টি ছোট কৃত্রিম উপগ্রহও উৎক্ষেপণ করা হয়। বিদেশী উপগ্রহগুলির মধ্যে রয়েছে, লিথুয়ানিয়ার একটি পরীক্ষামূলক কৃত্রিম উপগ্রহ, সামুদ্রিক ক্ষেত্রের জন্য লুক্সেমবার্গের চারটি কৃত্রিম উপগ্রহ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চারটি দূর নিয়ন্ত্রণ কৃত্রিম উপগ্রহ। ইসরো’র পোলার স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ যান – পিএসএলভি-সি ৫৯ ঐ কৃত্রিম উপগ্রহগুলিকে তাদের নির্দিষ্ট কক্ষপথে স্থাপন করে। গত বছরের ১১ই ডিসেম্বরের পরে এটিই ইসরোর প্রথম উৎক্ষেপণ। সে বার পিএসএলভি-সি ৪৮ এইবারের মতোই একটি পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ কক্ষপথে স্থাপন করেছিল।  

চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইসরো একটি যোগাযোগ সংক্রান্ত কৃত্রিম উপগ্রহ – জিএসএটি -৩০ মহাকাশে প্রেরণ করে, তবে সেটি উৎক্ষেপণ করা হয় একটি এরিয়ান রকেট দিয়ে ফরাসী গিয়ানা থেকে। এরপর থেকেই করোনা মহামারী পরিস্থিতির ফলে ইসরোর উৎক্ষপণ সংক্রান্ত সময়সূচি পুরোপুরি ব্যাহত হয়।  ২০২০-২১ অর্থবছরে ইসরোর সূর্য সংক্রান্ত অনুসন্ধান অভিযানের জন্য আদিত্য এল ওয়ান এবং ভারতের প্রথম মানববিহীন গগানায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ অভিযানের জন্য পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ সহ ২০টিরও বেশি কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা ছিল। ঐ সমস্ত নির্ধারিত উৎক্ষেপণের অর্ধেকই ছিল ইওএস –০১’এর মতো পৃথিবী পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত কৃত্রিম উপগ্রহ।   

৬৩০ কেজি ওজনের ইওএস -০১ একটি পৃথিবী পর্যবেক্ষণ কৃত্রিম উপগ্রহ যা কৃষিক্ষেত্র, বনাঞ্চল এবং বিপর্যয় মোকাবিলায় সহায়তার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এটি সমস্ত-আবহাওয়ায় কাজ করতে সক্ষম একটি র‍্যাডার ইমেজিং স্যাটেলাইট যা গত বছর চালু হওয়া রিস্যাট -২ বি এবং রিস্যাট -২ বিআরআই কৃত্রিম উপগ্রহের সঙ্গে একযোগে কাজ করবে। এই কৃত্রিম উপগ্রহটি সীমান্ত নজরদারি, অনুপ্রবেশ রোধ ও সন্ত্রাস দমন অভিযানের জন্যও বিশেষভাবে সহায়ক হবে। 

ইসরোর চেয়ারপার্সন ডঃ কে শিবন উৎক্ষেপণের পরে জানান, এই মিশন ইসরোর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং একেবারেই ব্যতিক্রমী ছিল কারণ বর্তমান অতিমারী পরিস্থিতিতে ‘ওয়ার্ক ফর্ম হোম’ ব্যবস্থার মাধ্যমে মহাকাশ সংক্রান্ত এই সমস্ত কর্মকাণ্ডের বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। প্রত্যেক মহাকাশ বিজ্ঞানীর  এই ধরণের গুরুত্বপূর্ণ মিশনের ক্ষেত্রে উপস্থিত থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে তিনি আশ্বস্ত করেছিলেন যে স্বাস্থ্য বিধি অনুসরণ ক’রে দলের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখেই পুরো কাজটি করা হয়েছে।  

এই সফল উৎক্ষেপণ আবারও পিএসএলভির উচ্চ নির্ভরযোগ্যতার পরিচয় দিয়েছে। এখনও অবধি ৫১টি উৎক্ষেপণের মধ্যে এটি মাত্র দুবার এবং একবার আংশিকভাবে উৎক্ষেপণে ব্যর্থ হয়েছে। ২০০৮ সালে চাঁদে ভারতের প্রথম মিশন চন্দ্রায়ন- ১, এবং ২০১৩ সালে মঙ্গল গ্রহ অভিযানে পিএসএলভি ব্যবহৃত হয়েছিল।  

পিএসএলভির এই সাফল্যের প্রেক্ষিতে ইসরো বেশ কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের জন্য পিএসএলভির মাধ্যমে উৎক্ষেপণ পরিষেবা দিচ্ছে। পিএসএলভির ২৭টি উৎক্ষেপণের মাধ্যমে এখনও অবধি ৩৩টি দেশের ৩১০টি বিদেশি উপগ্রহ সাফল্যের সঙ্গে কক্ষপথে স্থাপন করা হয়েছে। এই দেশগুলির মধ্যে  রয়েছে আলজেরিয়া, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, ইন্দোনেশিয়া,  ইজরায়েল, ইতালি, জাপান,  লিথুয়ানিয়া, লুক্সেমবুর্গ, নেদারল্যান্ডস, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক, ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ বেশ কিছু কয়েকটি দেশ।  

কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষিতে ইসরো ইতিমধ্যেই আরো বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনটি বেসরকারী ক্ষেত্রের জন্যও উপগ্রহগুলির সংহতিকরণ ও পরীক্ষার জন্য বরাত পেয়েছে। ইসরো আশাবাদী যে এর ফলে বেসরকারী শিল্পক্ষেত্রের সম্পূর্ণ কৃত্রিম উপগ্রহ নির্মাণের পথ প্রশস্ত হবে। বর্তমানে ইসরোর লক্ষ্য প্রতিবছর ১২ থেকে ১৮টি কৃত্রিম উপগ্রহ তৈরী করা।   

ইসরো এখন ভারতের মাটি থেকে ভারতীয়দের মহাকাশে পাঠানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ২০২২ সালে দেশের স্বাধীনতার ৭৫তম বার্ষিকীর প্রাককালে প্রথম  ভারতীয় নভশ্চরকে মহাকাশ অভিযানে পাঠানোর লক্ষ্য পূরণে ইসরো বিশেষভাবে আশাবাদী।  

(মূল রচনা – বিমান বসু)