ভারত কাতার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে পুনরুজ্জীবন

For Sharing

কাতার উপমহাসাগরীয় অঞ্চলের এক গুরুত্বপূর্ণ দেশ যার সঙ্গে ভারতের মজবুত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক রয়েছে। শক্তি নিরাপত্তা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং ভারতের প্রবাসী সম্প্রদায় দ্বিপাক্ষিক এই সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত করতে সহায়ক হচ্ছে। ভারতের শক্তি নিরাপত্তা ক্ষেত্রে কাতারের এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে এবং কাতার ভারতের সর্ববৃহৎ LNG সরবরাহকারী দেশ। ভারত ২০০৪ সালে কাতার থেকে বার্ষিক ৭.৫ মিলিয়ন টন LNG রপ্তানির জন্য ২৫ বছরের এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। ২০১৫ সালে যখন আন্তর্জাতিক পেট্রোলিয়ামের মূল্যে সঙ্কট দেখা দেয় সেই সময় দোহা, ভারতের অনুরোধে LNG’র দাম হ্রাস করতে সম্মত হয়েছিল। এর ফলে ভারতের শক্তি ক্ষেত্রে কাতারের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়েছে। একইভাবে ভারত, কাতার থেকে LNG আমদানিকারক বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ হিসেবে ক্ষুদ্র ওই উপদ্বীপ দেশের জন্য বিশেষ অবদান যোগাচ্ছে।
কাতার, ভারতের জন্য বিশ্বের প্রধান ২৫টি বাণিজ্য অংশীদার দেশের মধ্যে একটি। ২০১৯-২০ সালে ভারতের সঙ্গে কাতারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১০.৯৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং এটি উপমহাসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ GCC দেশগুলির মধ্যে UAE এবং সৌদি আরবের পর তৃতীয় বাণিজ্য অংশীদার দেশ। অন্যদিকে, ভারত, কাতারের ৫টি প্রধান বাণিজ্য অংশীদার দেশের মধ্যে একটি। ভবিষ্যতে ভারত ও কাতারের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অগ্রগতিতে প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। কাতার ভারতীয় বাজারের প্রধান বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অন্যতম। GCC দেশগুলির মধ্যে ভারতের বৈদেশিক বিনিয়োগ FDI ক্ষেত্রে কাতার চতুর্থ দেশ। ভারতও কাতারের ব্যবসায়িক পরিবেশে মানবসম্পদ সহ অর্থনীতির সমস্ত ক্ষেত্রে বিশেষ করে নির্মাণ ও পরিষেবা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান যোগাচ্ছে। কাতারের বৃহত্তম প্রবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে ৭ লাখ ভারতীয় রয়েছেন যা কাতারের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ।
এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডঃ এস জয়শঙ্করের দু’দিনের স্বতন্ত্র কাতার সফর বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বিশেষ করে এই সময়ে যখন ভারত কোভিড-১৯ অতিমারির জেরে অর্থনীতির ওপর যে বিরূপ প্রভাব পড়েছে তা কাটিয়ে উঠতে সচেষ্ট হচ্ছে এবং উপমহাসাগরীয় দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক আরও মজবুত করতে আগ্রহী হচ্ছে। ভারত ও কাতার কোভিড-১৯ অতিমারির কঠিন সময়ে আলোচনার মাধ্যমে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। অতিমারির সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কাতারের আমীর তামিমের সঙ্গে তিনবার টেলিফোনে বার্তালাপ করেছেন এবং উভয় নেতা কোভিড-১৯ অতিমারির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহযোগিতা করতে সম্মত হয়েছেন।
ডঃ জয়শঙ্কর তাঁর এই সফরে কাতারের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং তাঁদের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক বিষয়সমূহ নিয়ে আলোচনা করেছেন। ডঃ জয়শঙ্কর আমীরের পিতা শেখ হামাদ আল থানির সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন এবং ভারত-কাতার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতিতে তাঁর অবদানের প্রশংসা করেন। ডঃ জয়শঙ্কর, আমীর তামিমের সঙ্গে তাঁর বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমীর তামিমকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ বার্তা পেশ করেন। আমীর এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে যত শীঘ্র সম্ভব ভারত সফরের ইচ্ছে প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর আলোচনার কথা স্মরণ করে আমীর তামিম, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতিতে বিনিয়োগ ও শক্তি ক্ষেত্রে একটি টাস্ক ফোর্স গঠনে উভয় নেতার সম্মতির বিষয়টি উল্লেখ করেন। ডঃ জয়শঙ্কর, কোভিড অতিমারির সময়ে সে দেশে বসবাসকারী ভারতীয় সম্প্রদায়ের খেয়াল রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তরফে কাতারের নেতাদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
ডঃ জয়শঙ্কর কাতারের প্রধানমন্ত্রী তথা অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী খালিদ বিন খালিফা আল থানি সহ শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং উপ প্রধানমন্ত্রী তথা বিদেশ মন্ত্রী মহম্মদ বিন আবদুলরহমানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন। তিনি ২০২১ সালে ভারতে আয়োজিত প্রথম ভারত-কাতার যৌথ কমিশনের বৈঠকে যোগ দিতে সে দেশের বিদেশ মন্ত্রীকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান। উভয় নেতা গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন এবং শক্তি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, স্বাস্থ্য পরিচর্চা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও মজবুত করার বিষয়েও আলোচনা করেন।
ভারত ও কাতারের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কে উন্নতির প্রচেষ্টায় পররাষ্ট্র মন্ত্রী কাতারের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন। এই আলোচনায় ভারতে ব্যবসায়ের পরিবেশ ও বাজারের সুযোগ এবং মেক ইন ইন্ডিয়া ও আত্মনির্ভর ভারতের মত কর্মসূচির প্রচেষ্টায় সরকারের প্রয়াসের বিষয় তুলে ধরেন। ডঃ জয়শঙ্কর সে দেশে বসবাসকারী ভারতীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে ভার্চুয়াল মাধ্যমে আলোচনা করেন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে এবং কোভিড-১৯ অতিমারির বিরুদ্ধে ভারতের লড়াইয়ে তাঁদের অবদানের প্রশংসা করেন।
ভারত উপমহাসাগরীয় দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মজবুত করতে উদ্যোগী হচ্ছে। কাতার ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার দেশ এবং ডঃ জয়শঙ্করের সে দেশ সফর বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এক নতুন গতি আনবে বলেই আশা করা হছে। ( মূল রচনাঃ মুদাসির কামর)