নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের অস্থায়ী সদস্যপদ গ্রহণ

For Sharing

২০২১’এর পয়লা জানুয়ারি ভারতের এই নিয়ে আটবার রাষ্ট্রসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে দু’বছরের কার্যকাল শুরু হলো। ১৯৫০ সালে ভারত প্রথমবার নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্য মনোনীত হয়েছিল। এই সদস্য পদে ভারতের নির্বাচনে রাষ্ট্রসংঘ সাধারণ সভার দুই তৃতীয়াংশেরও বেশি সদস্য দেশ সম্মতি দিয়েছে। অপরদিকে এখনো পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য দেশ অথবা পি-ফাইভ দেশগুলির কেউই তাদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে নির্বাচনে এত বেশি সংখ্যক সদস্য দেশের সমর্থন পায়নি। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হিসেবে ভারত কতখানি প্রভাব বিস্তার করবে তা দুটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। প্রথমত ভারতের গৃহীত সিদ্ধান্ত গুলি নিরাপত্তা পরিষদ কিভাবে গ্রহণ করে তার ওপর। যা আবার নির্ভর করে স্থায়ী সদস্য দেশগুলির ভেটো প্রয়োগের অধিকারের ওপর। ১৯৪৬ সাল থেকে স্থায়ী সদস্য দেশগুলি মোট ২৯৩ বার ভেটো প্রয়োগ করেছে। এই ভেটো প্রয়োগের ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় তার ফলে প্রায়ই খেসারত দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। সর্বশেষ এই ধরনের উদাহরণ হল ২০২০’র প্রথম দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে অচলাবস্থা, যার ফলে নিরাপত্তা পরিষদ covid-19 অতিমারীর মোকাবিলায় সময়মত প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারেনি। স্থায়ী সদস্য দেশগুলির এই ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতার প্রেক্ষিতে নিরাপত্তা পরিষদে এবার ভারত তার অস্থায়ী সদস্য পদকে কাজে লাগিয়ে কিভাবে তার স্বার্থ রক্ষা করবে, সেটাই হবে ভারতের মত ক্রমশ শক্তিশালী বিকাশ শীল দেশগুলির সামনে বড় পরীক্ষা।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য পদ পাওয়ার জন্য তার প্রচার অভিযানে ভারত যে তিনটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়কে সামনে রেখেছে সেগুলিকে ঈপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে ভারতের ক্ষমতা। এগুলো হলো নিরাপত্তা পরিষদের সন্ত্রাস দমন প্রস্তাব গ্রহণ, রাষ্ট্রসঙ্ঘ শান্তিরক্ষী মিশনের সার্থক প্রয়োগ এবং মানব কল্যাণমুখী প্রযুক্তির প্রয়োগ। এই বিষয়গুলি নিরাপত্তা পরিষদের বিচার্য বিষয় সমূহের অন্যতম; এবং এগুলিকে উপযুক্ত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে ভারতকে অন্যান্য সদস্য দেশগুলিকে পাশে নিয়ে এগোতে হবে। ২০২০ সালের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের নির্বাচনে আফগানিস্থান পাশে দাঁড়িয়েছে। আজকের দিনে ভারত ও আফগানিস্তান-এই দুটি দেশ তাদের স্বার্থের পরিপন্থী সন্ত্রাসবাদ দমনে আগের তুলনায় অনেক বেশি পরস্পর সহায়তা করছে। আফগানিস্তানের উন্নয়নী প্রক্রিয়ায় ভারত এক বড় মাপের সহায়তা দেয়। এর জন্যই ভারতকে আফগানিস্তানের স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে যেতে নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব গ্রহণে উপযুক্ত প্রভাব বিস্তার করতে হবে। ভারত এই লক্ষ্যকে এগিয়ে নিয়ে যেতে কতখানি সফল হবে তা নির্ভর করে স্থায়ী সদস্য দেশের সমর্থনের ওপর, যেগুলিকে তাদের আঞ্চলিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধির জন্য সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অবস্থান গ্রহণে প্রায়ই দ্বিধাগ্রস্থ দেখা যায়। কাজেই শান্তি নিরাপত্তা ও উন্নয়ন-এই তিনটি বিষয়ে ইপ্সিত ফল পেতে কূটনৈতিক দিক থেকে ভারতকে অনেক বেশি সক্রিয় হতে হবে।
রাষ্ট্রসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে ভারত সব সময় এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে এসেছে; এবং এ সংক্রান্ত খসড়া চুক্তি সম্পাদনে ভারত এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছে। ভারত তার কূটনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে রাষ্ট্রসংঘ শান্তিরক্ষা কাজকে কেবলমাত্র মানবিক স্বার্থ রক্ষার ছাড়াও সংশ্লিষ্ট দেশে জাতীয় প্রশাসনিক কাঠামোকে শক্তিশালী করার কাজে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে আসছে। লাইবেরিয়া এবং দক্ষিণ সুদানে রাষ্ট্রসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে ভারতের মহিলারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছে,যা নিরাপত্তা পরিষদের সামনে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে । কাজেই ভারত এই বিষয়টিকে নারী সুরক্ষা, শান্তি, নিরাপত্তা এবং অসামরিক মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কাজে লাগাতে পারবে।
একইভাবে মানবিক ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর বিষয়ে ভারতের যে ব্যাপক অভিজ্ঞতা রয়েছে তাকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন ক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ভূমিকা সম্পর্কে নিরাপত্তা পরিষদের আলাপ-আলোচনায় ভারত শীর্ষস্থানীয় ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে। ধারাবাহিক উন্নয়নের জন্য ভারতের যে সর্বাত্বক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে তাকে কাজে লাগিয়ে ডিজিটাল প্রযুক্তির ভিত্তিতে এক নতুন বিশ্ব ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। নিরাপত্তা পরিষদে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশ হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ভারত এই অঞ্চলের স্বার্থকে নিরাপত্তা পরিষদের আলাপ-আলোচনায় অগ্রাধিকার দিতে পারবে। এই সব দেশের মধ্যে আছে আফগানিস্থান, ইরান, সিরিয়া এবং প্যালেস্তাইন। এই কাজে সফল হলে নিরাপত্তা পরিষদে এই অঞ্চল থেকে নির্বাচিত স্থায়ী সদস্য দেশগুলির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভারত উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার কোরতে পারবে।
২০২০ সালে রাষ্ট্রসঙ্ঘে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর তিনটি ভাষণে সংস্কারকৃত বহুপাক্ষিকতাবাদকে রাষ্ট্রসংঘের একটি প্রভাবশালী সদস্য দেশ হিসেবে ভারতের জন্য অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে আছে নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার সাধন। ভারত এখন নিরাপত্তা পরিষদে তার আটবারের সদস্যপদকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে যে বহুবিধ চ্যালেঞ্জ রয়েছে,তার সমাধানে নিরাপত্তা পরিষদকে আরও বেশি মাত্রায় সক্রিয় করে তুলতে পারবে। ( মূল রচনা:- অশোক কুমার মুখার্জি)