পাকিস্তানে রাজনৈতিক ছলচাতুরি অব্যহত

For Sharing

পাকিস্তানের বিরোধী দলগুলিকে নিয়ে গঠিত সরকার বিরোধী জোট – পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্ট – পিডিএম, লাহোরের মিনার-এ-পাকিস্তানে, ২০২০ সালে তাদের প্রথম বিক্ষোভের পর্ব সমাপ্ত করেছে এবং ইমরান খানের নেতৃত্বে তেহরি-এ ইনসাফ সরকারের পতনের জন্য তা ‘চূড়ান্ত আঘাত’ বলে আখ্যা দিয়েছে। তবে লাহোর ‘জলসা’ কাঙ্ক্ষিত ফলাফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে এবং পিএমএল-এন দলের দুর্গ হিসাবে পরিচিত পাঞ্জাবেও বিশেষ সাফল্য পায় নি। পিডিএম বিক্ষোভের দ্বিতীয় পর্বে ইসলামাবাদে লং মার্চের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে পিডিএমের মনোবলে ঘাটতি রয়েছে। পিডিএমের অনেক সদস্যই জাতীয় ও প্রাদেশিক সভা থেকে পদত্যাগের ধারণার বিরোধিতা করেছেন। লাহোর জলসার পরে এটাই পিডিএমের পরবর্তী পদক্ষেপ বলে মনে করা হয়েছিল।   

জমায়ত-এ উলেমা-এ ইসলামি (ফ)-তে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং মৌলানা ফজল-উর-রেহমান বিরোধী কণ্ঠস্বর আরও শক্তিশালী হয়েছে। একই সঙ্গে, প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এনআরও প্রসঙ্গ ব্যতীত যে কোনও বিষয়ে পিডিএমের সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রস্তুত বলে উল্লেখ ক’রে পাকিস্তান সরকার তার পাল্টা কৌশল জোরদার করেছে। ইসলামাবাদে আয়ের জ্ঞাত উৎস বহির্ভূত সম্পদ সংক্রান্ত পিএমএল-এনের বৈঠকের পর পিএমএল-এন’এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব খাজা মোহাম্মদ আসিফকে ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি ব্যুরো – এনএবির গ্রেপ্তার করার ঘটনা পিডিএমকে চূড়ান্ত ধাক্কা দিয়েছে।       

সরকারের ওপর আরও চাপ বৃদ্ধির লক্ষ্যে, পিডিএম সাম্প্রতিকতম বৈঠকের পরে স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে ইমরান খান পদত্যাগ না করলে ইসলামাবাদের উদ্দেশ্যে লংমার্চ আসলে রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদর দফতর অভিমুখে লংমার্চ হবে। আপাতত, পিডিএম পিটিআই সরকারকে ক্ষমতা ছাড়ার জন্য ৩১শে জানুয়ারির সময়সীমা দিয়েছে। এরপরে পিডিএম তাদের বিক্ষোভ আরো জোরদার করবে। তারা রাওয়ালপিন্ডির দিকে অগ্রসর হওয়ার এবং  পাকিস্তান নির্বাচন কমিশন – ইসিপি এবং এনএবির বাইরে বিক্ষোভ সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পিডিএম প্রধান মওলানা ফজল-উর-রেহমান বলেছেন, এবার তাঁদের লক্ষ্য হবে সেনা প্রতিষ্ঠান যা ঐ জাল ইমরান খান সরকারের প্রতিষ্ঠা করেছে। পিডিএম সেনাবাহিনী ও জেনারেলদের সম্মান করে তবে এখন তাদের সাংবিধানিক দায়িত্বগুলির দিকেই মনোনিবেশ করতে হবে। 

পাকিস্তান সরকার ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নওয়াজ শরীফের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পিটিআই সরকার জানিয়েছে, এর ফলে নওয়াজ শরীফ রাষ্ট্রহীন বলে গণ্য হবেন এবং তাঁকে হয়   ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন জানাতে হবে বা অন্য কোনও দেশে (সৌদি আরব বা কাতার) উড়ে যেতে হবে নতুবা পাকিস্তানে ফিরে এসে পাকিস্তানের আদালতের মুখোমুখি হতে হবে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, শ্রী  শরীফের পাসপোর্ট বাতিল হলে তাঁকে ‘রাষ্ট্রবিহীন’ হিসাবে তুলে ধরলেও সত্যটি হল,  তিনি একজন পাকিস্তানি নাগরিক এবং তাঁর পাসপোর্ট বাতিল হলে তিনি  কেবলমাত্র আন্তর্জাতিক সফর করতে পারবেন না।    

সর্বশেষ লাহোর বৈঠকের পরে, পিডিএম, পাকিস্তান পিপলস পার্টির গণতান্ত্রিক পথ অবলম্বনের পরামর্শকে মেনে নিয়েছে কারণ তারা আসন্ন উপনির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উল্লেখ্য, করোনা অতিমারীর দরুণ পাকিস্তানে জাতীয় ও প্রাদেশিক স্তরের আটটি আসনে উপনির্বাচন পিছিয়ে দিতে হয়। ইসিপি জানিয়েছে, এটি আসন্ন সিনেট নির্বাচনের জন্য ইলেক্টোরাল কলেজ সম্পূর্ণ করার পথ সুগম করবে। কিছু বিরোধী সদস্য এও ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে পিডিএম দীর্ঘকালীন লড়াই চালিয়ে যেতে পারে এবং এ বছর ইমরান খানের সরকারের পতনের কোনো সম্ভবণা নেই। তবে মূল কথাটি হল, ব্যপক মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনীতির বিপদজনক অবস্থা। এর পাশাপাশি ইমরান খানের প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি যে সরকারের প্রথম দেড় বছর জনগণের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করতে পারে এমন বিভিন্ন সমস্যা অনুধাবন করতেই অতিবাহিত হয়েছে। জনগণ রাজনৈতিক দলগুলির সমর্থন ছাড়াই রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানাতে পারে।

এই রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই, ইমরান খান সরকার সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন ক’রে পাঁচ বছরের জামিনে মুক্ত থাকার পরে ২৬/১১ মুম্বাই সন্ত্রাসবাদী হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী জাকির-উর রহমান নকভিকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে এটি প্যারিস ভিত্তিক সন্ত্রাসে অর্থ যোগানের  বিরুদ্ধে নজরদারি সংস্থা – ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স – এফএটিএফ’কে প্রভাবিত করার জন্য বলে মনে করা হচ্ছে। আগামী মাসে এর পুর্ণাঙ্গ অধিবেশন হওয়ার কথা রয়েছে যেখানে পাকিস্তান ধূসর তালিকাভুক্তই থেকে যাবে না তাদের কালো তালিকাভুক্ত করা হবে তা নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।   

(মূল রচনা – জৈনাব আক্তার)