ফিজিকে মানবিক সহায়তা ভারতের

For Sharing

ভারতের সঙ্গে ফিজির যুগ প্রাচীন সম্পর্ক রয়েছে। ১৮৭৯ সালে যখন ইন্ডেনটার ব্যবস্থাপনার আওতায় ভারতীয় শ্রমিকদের আঁখ চাষের জন্য ফিজিতে নিয়ে যাওয়া হয় তখন থেকেই ভারতের সঙ্গে ফিজির সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ১৮৭৯ সাল থেকে ১৯১৬ সালের মধ্যে ৬০ হাজার ভারতীয় শ্রমিককে ফিজিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিংশ শতকের গোঁড়ার দিকে ভারতীয় ব্যবসায়ী এবং অন্যান্যরাও ফিজিতে যেতে শুরু করে। শ্রমিকদের বিক্ষোভ এবং সি এফ আন্ড্রুজের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে ১৯২০ সালে ইন্ডেনটার ব্যবস্থাপনা অবলুপ্ত করা হয়। উল্লেখ্য, সি এফ আন্ড্রুজ ১৯১৫ এবং ১৯১৭ সালে ফিজি সফর করেন। বর্তমানে ফিজির ৯ লাখ জনসংখ্যার ৩৭ শতাংশই ভারতীয় বংশোদ্ভূত। ১৯৭০ সালে ফিজির স্বাধীনতা অর্জনের আগে সে দেশে বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের স্বার্থরক্ষায় ১৯৪৮ সাল থেকে ভারতের একজন কমিশনার পদস্থ আধিকারিককে সেখানে পাঠানো হয়। ফিজির স্বাধীনতার পর ওই কমিশনারের পদ উন্নীত করে তা হাই কমিশনারে পরিণত করা হয়। উভয় দেশের মধ্যেই দৃঢ় ও মজবুত সম্পর্ক রয়েছে। ভারত ও ফিজির মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের সফর অব্যাহত রয়েছে।
ভারত, ঘূর্ণিঝড় বিধস্ত মানুষের সহায়তায় ইতিমধ্যেই ফিজিতে সহায়তা পাঠিয়েছে। এই দ্বীপ রাষ্ট্রে ২০২০ সালের ১৭-১৮ ডিসেম্বরে প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘ঈষা’ আছড়ে পড়েছিল। ওই ঘূর্ণিঝড়ে প্রবল ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ভারত সরকার ঘূর্ণিঝড় বিদ্ধস্ত মানুষদের জন্য জরুরীকালীন ভিত্তিতে আশ্রয় ও স্বাস্থ্য পরিচর্চা সরঞ্জাম সহ ত্রাণ সামগ্রী সেখানে পাঠায়।
অতিমারির চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, ভারতের জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী NDRF স্বল্প সময়ের মধ্যেই ৬ টন ত্রাণ সামগ্রী সংগ্রহ করে ভারতীয় বিমান সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়া ও ফিজি বিমান সংস্থার সহায়তায় অস্ট্রেলিয়ার সিডনির মধ্য দিয়ে সে দেশে পৌঁছে দেয়। তিন দেশের একাধিক সংস্থার সহায়তার ফলেই অতি দ্রুত এই সহায়তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
উভয় দেশের মধ্যে গভীর ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তিতে ভারত ফিজির সঙ্কটপূর্ণ সময়ে সর্বদা সে দেশের পাশে থেকেছে। ২০১৬ সালে ফিজিতে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ‘উইস্টন’-এর ফলে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল সে সময়েও ভারত সে দেশের পাশে ছিল। ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াসার’এর সময় ভারতের পাঠানো ত্রাণ সামগ্রী বন্ধুত্বপূর্ণ বিদেশী দেশগুলির প্রতি মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ ত্রাণ HADR সহায়তা প্রদানে ভারতের প্রতিশ্রুতিকেই তুলে ধরেছে।
বিপর্যয় ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা ২০১৯ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় উদ্যোগ IPOI’এর এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ভারত সে দেশের ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়ের জীবিকা নির্বাহের জন্য এবং পরিকাঠামো ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ফিজির প্রচেষ্টায় সম্পূর্ণ সমর্থন দিতে প্রস্তুত।
ভারত, প্রশান্ত মহাসাগরীয় ফোরাম IPF দেশগোষ্ঠীর জন্য ভারতের সহায়তা ঘোষণার অঙ্গ হিসেবে ফিজি পুলিশের জন্য ৫টি টয়োটা গাড়ি, ৫০০ সেলাই মেশিন, ৫টি অ্যাম্বুলেন্স, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের জন্য ১৩৪টি জলের ট্যাঙ্ক, সুভা শহরের জন্য মোবাইল লাইব্রেরী ভেহিক্যাল, কিউভার সড়ক সংস্কার, লাসাবার নার্সিং ও স্বাস্থ্য পরিচর্চা কেন্দ্র TISI সঙ্গম কলেজের জন্য বই ও সরঞ্জাম প্রদান করেছে। এছাড়াও ভারত প্রকল্প সহায়তা হিসেবে ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে আনুসাঙ্গিক সহ ৫ সেট আঁখের ক্রাশ ইউনিট এবং ফিজির কিডনি ফাউন্ডেশনকে নতুন ডায়লিসিস কেন্দ্রের জন্য মেশিন ও সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য সহায়তা প্রদান করেছে।
এছাড়াও, ২০১৪ সালে ভারত থেকে ওষুধ ক্রয়ের জন্য ১০ লাখ টাকা অনুদান প্রদান করেছে। ত্রাণ সামগ্রী হিসেবে ২০০৯ সালে এক লাখ মার্কিন ডলার সহায়তা প্রদান করেছে। ফিজিতে ২০১২ সালের জানুয়ারি ও মার্চ মাসে বন্যার পর ভারত জুলাই মাসে ২ লাখ মার্কিন ডলার সহায়তা প্রদান করেছে। তাছাড়া ভারত ২০১৩ সালে সে দেশে ঘূর্ণিঝড় ‘ইভান’-এর পর এক লাখ মার্কিন ডলার সহায়তা দিয়েছে। অন্যদিকে, ফিজি ২০০৫ সালে কাশ্মীরে ভূমিকম্পের পর ফিজির মুদ্রায় ৩০,০০০ ডলার সহায়তা দিয়েছে।
ফিজির চিনি কলগুলিকে উন্নত করার জন্য ভারত ঋণ হিসেবে ৫০.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদান করে। এছাড়া ভারতের বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণ কোর্সের জন্য ভারতীয় প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা ITEC’র আওতায় ৫৫টি স্লট এবং TCS কলম্বো পরিকল্পনার আওতায় ৩০টি স্লট প্রদান করেছে। এছাড়াও এবছর ফিজির প্রতিরক্ষা আধিকারিকদের দীর্ঘ ও স্বল্প মেয়াদী প্রশিক্ষণের জন্য ভারতীয় নৌবাহিনীর ৪০টি এবং সেনা বাহিনীর ১০টি স্লট প্রদান করা হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিজির ছাত্রছাত্রীদের জন্য স্কলারশিপেরও ব্যবস্থা আছে। ( মূল রচনাঃ কৌশিক রায়)