হংকংয়ে চীনের কঠোর ব্যবস্থা আরোপ

For Sharing

হংকংয়ের পুলিশ চীনের নতুন জাতীয় সুরক্ষা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রায় ৫০জন গণতন্ত্রপন্থী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। গণতন্ত্রপন্থী সদস্যরা গত বছর একটি বেসরকারি প্রাথমিক নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। হংকং আইনসভা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে গণতন্ত্রপন্থী আইন প্রণেতাদের সম্ভাবনা বাড়ানোর জন্য এটি করা হয়।
গত বছরের জুনে পেইচিং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের জন্য চীনের জাতীয় সুরক্ষা আইন পাস করার পর থেকে এই গণ-গ্রেপ্তার হংকংয়ের গণতন্ত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ। হংকং পুলিশ গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
এই দ্বীপের বৃহত্তম বিরোধী দল হংকং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কমপক্ষে সাত জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়, তাদের মধ্যে একজন প্রাক্তন দলীয় চেয়ারম্যানও রয়েছেন। প্রাক্তন সংসদ সদস্যদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের হংকং বিক্ষোভের মূল ব্যক্তি এবং প্রাক্তন আইন অধ্যাপক বেনি তাইকেও পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তিনি ছিলেন গত বছর প্রাইমারিগুলির অন্যতম প্রধান আয়োজক।
গণতন্ত্রপন্থী সক্রিয় সদস্য জোশুয়া ওয়াংয়ের বাড়িতেও অভিযান চালানো হয়েছে, তিনি গত বছর অনধিকৃত বিক্ষোভের আয়োজন ও অংশ গ্রহণের জন্য দীর্ঘ সময় হাজত বাস করেন। খবরে বলা হয়েছে, গণতন্ত্রপন্থী সকল প্রার্থী যারা বেসরকারী প্রাথমিক নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
হংকংয়ের একটি বিশিষ্ট গণতন্ত্রপন্থী অনলাইন নিউজ সাইটের সদর দফতরেও পুলিশ তল্লাশি চালিয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলিতে, সরকার বিরোধী বিক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত থাকায় হংকং বেশ কিছু গণতন্ত্রপন্থী নেতাকর্মীকে জেলে পাঠিয়েছে। গণমাধ্যমকর্মী ও গণতন্ত্রপন্থী নেতাকর্মীসহ অন্যদের বিরুদ্ধে জাতীয় সুরক্ষা আইনের আওতায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
চীনের জাতীয় সুরক্ষা আইনে শহরের বিভিন্ন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার জন্য বিদেশী শক্তিগুলির সাথে যোগাযোগ, বিচ্ছিন্নতা, সন্ত্রাসবাদ প্রভৃতির মতো কাজকে অপরাধমূলক কার্যকলাপ বলে গণ্য করা হয়েছে। গুরুতর অপরাধীরা সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দন্ডিত হতে পারে। বেশ কয়েকটি দেশ এবং রাষ্ট্রসংঘ এই আইনের সমালোচনা করেছে।
গণতন্ত্রপন্থী নেতাকর্মী এবং আইন প্রণেতারা গত জুলাইয়ে একটি আইনসভা নির্বাচনে তাদের কোন্‌ প্রার্থীকে দাঁড় করানো উচিত তা নির্ধারণ করার জন্য একটি বেসরকারী প্রাথমিক নির্বাচনের আয়োজন করে। (এটি কোভিড -১৯ মহামারীর কারণে স্থগিত হয়েছিল)। গণতন্ত্রপন্থী শিবির নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে চায় এবং চীনপন্থী বলে বিবেচিত বিলগুলির বিরুদ্ধে ভোট দিতে চেয়েছিল।
৬ লাখের বেশি হংকং নাগরিক প্রাইমারীতে ভোট দেয়, যদিও পেইচিংপন্থী আইন প্রণেতারা এবং রাজনীতিবিদরা এর সমালোচনা করেন এবং হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে এর ফলে শহরে বলবৎ সুরক্ষা আইন লঙ্ঘিত করতে পারে। সরকার বিরোঘী বিক্ষোভের অসন্তোষ দমন করতে এই আইন বলবৎ করা হয়েছিল।
হংকংয়ের চিফ এক্সিকিউটিভ ক্যারি ল্যাম গত বছর বলেছিলেন যে প্রাথমিক নির্বাচনের লক্ষ্য যদি হংকং সরকারের প্রতিটি নীতিগত উদ্যোগকে প্রতিহত করা হয়, তবে এটি জাতীয় সুরক্ষা আইনের অধীনে একটি অপরাধ।
পেইচিং একে হংকংয়ের নির্বাচনী ব্যবস্থার “মারাত্মক প্ররোচনা” বলে অভিহিত করে প্রাইমারীগুলিকে অবৈধ বলে ঘোষণা করে।
১৯৯৭ সালে ব্রিটিশরা হংকংকে চীনের কাছে হস্তান্তর করার পর, এই শহরটি “এক দেশ, দুই ব্যবস্থা” কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, পেইচিং এই দ্বীপ-শহরটির উপর আরও নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে, হংকংয়ের স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা করা হচ্ছে।
গত নভেম্বর মাসে, চীন একটি প্রস্তাব পাস করার পর হংকংয়ের সমস্ত গণতন্ত্রপন্থী আইন প্রণেতা পদত্যাগ করেন কারণ এই প্রস্তাবের ফলে চারজন আইন প্রণেতা অযোগ্য হয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন যে চীন হংকংয়ে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। দমন-পীড়ন, প্রতিরোধ সৃষ্টি করে এবং হংকংয়ের লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের ভোটাধিকার অর্জন এবং গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের জন্য লড়াই চালিয়ে যাবেন বলে নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন।
মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলি বলছে, চীনের জাতীয় সুরক্ষা আইন একটি কঠোর আইন । এই আইনের বলে চীন সরকার সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগের জন্য জনগণকে গ্রেপ্তার এবং দীর্ঘ দময় ধরে জেল বন্দী করে রাখছে। অনেক বিশ্লেষক বলেছেন, পেইচিং এর লক্ষ্য হল হংকংকে মূল চীন ভূখণ্ডের একটি সম্প্রসারিত এলাকা বলে গণ্য করা। এটি হংকংয়ের সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, কারণ এর নাগরিকরা ১৯৯৭ সাল অবধি ব্রিটিশ উপনিবেশের নাগরিক হওয়ার ফলে গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করে এসেছে। (মূল রচনা: পদম সিং)