ভারত -শ্রীলংকা অংশীদারিত্ব

For Sharing

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডক্টর এস জয়শঙ্কর শ্রীলংকার বিদেশমন্ত্রীর আমন্ত্রণে দুদিনের সরকারিভাবে কলম্বো সফর করলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নতুন বছরে এই প্রথম বিদেশ সফর এবং শ্রীলংকাতেও এই নতুন বছরে অন্য কোন দেশের সরকারি প্রতিনিধির ওই দেশ সফর। ডঃ জয়শংকর এই সফরে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি গোটাবাওয়া রাজাপক্ষে, প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে, বিদেশমন্ত্রী দীনেশ গুণবর্ধনে, মৎস্য পালন মন্ত্রী ডগলাস দেবেন্দ্র, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রম সিংহে, বিরোধী দল নেতা সাজিদ প্রেমদাশা, আবাসন ও সমষ্টিগত পরিকাঠামো মন্ত্রী জীবন থোন্ডামান, গ্রাম উন্নয়ন মন্ত্রী সদাশিবন বিয়ালেন্দ্রিয়ন তামিল নেতা এবং শ্রীলঙ্কার ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সঙ্গে কথা বললেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল শ্রীলংকা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সামনে যে সমস্ত সুনির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেগুলির সমাধানসূত্র খুজে দেখা। দুটি দেশের মধ্যে সম্পাদিত সমঝোতা স্মারক পত্র এবং বিভিন্ন চুক্তি রূপায়ণে যে বিলম্ব হচ্ছে সে বিষয় নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে আলোচনা হল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিকাঠামো, শক্তি এবং যোগাযোগ সম্পর্কিত দ্বিপাক্ষিক প্রকল্প গুলির আশু রূপায়ণের আহ্বান জানালেন শ্রীলংকার অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের স্বার্থে। শ্রীলংকা বিদেশ মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পর ডক্টর জয়শঙ্কর দুটি দেশের মধ্যে, বিশেষ করে ওষুধ শিল্প ও পর্যটন ক্ষেত্রে বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করলেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলম্বো বন্দরে ইস্ট কন্টেইনার টার্মিনাল চুক্তি রূপায়ণের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করলেন, যেটি ২০১৯’এর মে মাসে শ্রীলংকার পূর্ববর্তী সরকারের আমলে শ্রীলঙ্কা, ভারত ও জাপানের মধ্যে সম্পাদিত হয়েছিল। এই টার্মিনালের উন্নয়নের সঙ্গে ভারতের সার্থ বিশেষভাবে জড়িত কারণ ভারত থেকেই কলম্বো বন্দরে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ আমদানি রপ্তানি ব্যবসা হয়।

শ্রীলংকার সামাজিক সংগঠন ও মানব সম্পদ উন্নয়ন এবং তার সঙ্গে ভারতের অংশীদারিত্ব সে দেশের সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে এসেছে। শ্রীলংকার নেতৃবর্গের সঙ্গে আলোচনাকালে ডক্টর জয়শঙ্কর সে দেশের সঙ্গে কৃষি, প্রযুক্তি দক্ষতা উন্নয়ন, শহর অঞ্চলের উন্নয়ন সহ বিভিন্ন বৃত্তিগত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কার উন্নয়নের সঙ্গে অংশীদারিত্ব অব্যাহত রাখার স্বার্থে ভারতের আগ্রহের কথা জানালেন। ডঃ জয় শংকর শ্রীলংকার ক্রমবর্ধমান নৌ ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জসমূহের মোকাবিলায় সেদেশের কাজকর্মের গুণগত উন্নতি সাধনে সহায়তায় ভারতের আগ্রহের কথা ব্যক্ত করলেন।

ডক্টর জয়শঙ্কর covid-19 অতিমারীর সময়ে এবং এই অতিমারী পরবর্তী পরিস্থিতিতেও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখতে ভারতের ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন এবং শ্রীলঙ্কার অনুরোধে সেদেশে কোভিড 19 প্রতিষেধক টিকা পাঠানোর জন্য ভারতের আগ্রহের কথা জানালেন। ভারত -শ্রীলংকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দু’দেশের মৎস্যজীবীদের স্বার্থ এবং তামিল সম্প্রদায়ের যথাযোগ্য পূনর্বাসনের বিষয়। ২০২০ সালের ৩০’এ ডিসেম্বর শ্রীলংকার মৎস্যচাষ মন্ত্রী ডগলাস দেবেন্দ্রর সঙ্গে যৌথ কর্মী গোষ্ঠীর সর্বশেষ বৈঠকের পর এ বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার অগ্রগতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যালোচনা করলেন। শ্রীলংকায় আটক ভারতীয় মৎস্যজীবীদের অবিলম্বে মুক্তির জন্যেও তিনি আবেদন জানালেন।

উল্লেখ করা যেতে পারে, শ্রীলংকার বর্তমান সরকারের কয়েকজন সদস্য সেদেশের সংবিধানের ১৩ তম সংশোধনী বাতিলের পক্ষে সওয়াল করছেন ওই সংশোধনীর আওতায় প্রাদেশিক পরিষদ গুলির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের সংস্থান রয়েছে। ১৯৮৭ সালে ভারত- শ্রীলংকা চুক্তি সম্পাদনের সময় এই সংশোধনের সুপারিশ করা হয়েছিল, পরে শ্রীলংকার সংসদে তা অনুমোদিত হয়। সেই থেকে ভারত, শ্রীলংকার স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে এসেছে। নতুন দিল্লি মনে করেন শ্রীলংকার সরকারের কালবিলম্ব না করে ১৩ তম সংবিধান সংশোধনী রূপায়ণের মাধ্যমে প্রাদেশিক পরিষদ গুলির হাতে উপযুক্ত ক্ষমতা প্রদান করা।

এই অঞ্চলে ভূ-কৌশলগত ঘটনা সমূহের প্রেক্ষিতে পারস্পরিক সংবেদনশীলতা বা স্পর্শকাতরতাকে উপযুক্ত মর্যাদা দিয়ে সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেবার লক্ষ্যে দু দেশের সরকার নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। দুটি পক্ষ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ক্রমাগত এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার এবং বন্ধু দেশ হিসেবে পারস্পরিক আস্থা, স্বার্থ, মর্যাদা ও সংবেদনশিলতার ভিত্তিতে নতুন দিল্লি সব সময় কলম্বোর পাশে আছে বলে ভারতের পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরের মাধ্যমে। (মূল রচনাঃ- ডঃ গুলবিন সুলতানা)