ভারত সন্ত্রাসবাদের কঠোর হাতে মোকাবিলার আহ্বান জানালো

For Sharing

রাষ্ট্রসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ একটি ভার্চুয়াল বৈঠকের মাধ্যমে তার গৃহীত ১৩৭৩ নম্বর প্রস্তাবের কুড়িতম বার্ষিকী উদযাপন করলো। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সংগ্রামে এই প্রস্তাবটি এক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত। টিউনেশিয়ার উদ্যোগে এ বিষয়ে এই বৈঠকের আয়োজন করা হলো। ৯/১১ সন্ত্রাসবাদী হামলার প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত ১৩৭৪ নম্বর প্রস্তাবের ওপর এই বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড এস জয়শঙ্কর বলেন, এই প্রস্তাব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে সন্ত্রাসবাদ এখন সমগ্র মানব জাতির সামনে সবচেয়ে বড় বিপদ।এতে কেবলমাত্র জনজীবন বিপর্যস্ত হয় না, মানবিকতার মূল স্তম্ভটি আক্রান্ত হয়। এই প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে নিরাপত্তা পরিষদ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সন্ত্রাসবাদের বিপদের মোকাবিলার সংকল্প ব্যক্ত করেছিল।
ডক্টর জয়শঙ্কর তাঁর ভাষণে বলেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সংগ্রামে ভারত সব সময় সামনের সারির দেশগুলোর মধ্যে অবস্থান করছে। ১৩৭৩ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণের অনেক আগেই ১৯৯৬ সালে ভারত সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় একটি সর্বাত্মক আইনি কাঠামো রচনার উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বিষয়ক সর্বাত্মক চুক্তি- সিসিআই টির রচনার প্রস্তাব করে। এছাড়াও ভারত রাষ্ট্রসঙ্ঘের গৃহীত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে প্রধান প্রধান চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে এবং তা অনুমোদন করেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বললেন, ১৩৭৩ নম্বর প্রস্তাব এবং সন্ত্রাস দমন কমিটি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এছাড়াও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী সংগ্রামে রাষ্ট্রসংঘ যে অন্যান্য প্রস্তাব গ্রহণ করেছে তাতে ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। উল্লেখ্য সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় রাষ্ট্রসঙ্ঘের শাস্তিমুলক ব্যবস্থা সংক্রান্ত পদক্ষেপ খুব কার্যকরও প্রমাণিত হয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদি গোষ্ঠী এবং জঙ্গী ব্যক্তিগতভাবে ভার্চুয়াল মুদ্রা ইত্যাদি নতুন নতুন, আধুনিক বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের মারণ ক্ষমতা বিশেষভাবে বৃদ্ধি করেছে। সামাজিক প্রচার মাধ্যমও যুব সমাজকে চরমপন্থী কার্যকলাপে প্ররোচিত কোরছে। কোভিড ১৯ অতিমারী এই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। লকডাউন পরিস্থিতি এবং অর্থনীতির ওপর তার প্রতিকূল প্রভাব আর্থিক জীবনযাত্রাকে দুর্দশাগ্রস্ত করে তুলেছে। এবং এই পরিস্থিতিকে বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদি গোষ্ঠী কাজে লাগাতে চেষ্টা করছে। সন্ত্রাসবাদীদের চিহ্নিত করতে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে এবং তাদের অর্থ সহায়তার উৎস গুলি চিহ্নিত করতে যে প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রয়োজন হয় অধিকাংশ দেশই তা গড়ে তুলতে পারেনি। বহু দেশ সন্ত্রাসবাদীদের অর্থ সহায়তা করে এবং তাদের নিরাপদ আশ্রয় প্রদান করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই ধরনের দেশকে চিহ্নিত করে তাদের জবাবদেহী করতে হবে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে অর্থবহ করে তুলতে এবং তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ সুনিশ্চিত করতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেশ কিছু প্রস্তাব দেন, যেগুলির ওপর ভিত্তি করে একটি কর্ম পরিকল্পনা গৃহীত হতে পারে। বিনা দ্বিধায় সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলার রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি গড়ে তুলতে হবে। সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করা বা তাদের বাহবা দেওয়া রোধ করতে সংশ্লিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের প্রতিটি সদস্য দেশকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রসংঘ চুক্তি এবং সব প্রস্তাব মেনে চলতে হবে এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে যে কোনো বিভেদমূলক শক্তিকে শক্ত হাতে দমন করতে হবে; কারণ সন্ত্রাসবাদীদের একমাত্র পরিচয় যে তারা সন্ত্রাসবাদী এবং সন্ত্রাসবাদীদের ভালো-মন্দ –এই দুই শ্রেণিতে ভাগ করা যায় না।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলায় রাষ্ট্রসংঘ কমিটিগুলির কর্মপ্রণালীর সংস্কারের আহ্বান জানালেন। কমিটিগুলির কাজকর্মে স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং কার্যকারিতা হল সময়ের আহ্বান। সব দেশকে চরমপন্থী ভাবাদর্শকে দমন করতে হবে। এই ভাবাদর্শ বিশ্বকে বিভক্ত করে এবং সামাজিক কাঠামোর ক্ষতিসাধন করে। এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি চরমপন্থী কার্যকলাপের জন্ম দেয় এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও ঘৃণার পরিবেশ সৃষ্টি করে। রাষ্ট্রসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদকে এ বিষয়গুলোর প্রতি উপযুক্ত নজর দিয়ে যথাযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। রাষ্ট্রসংঘ শাস্তিমুলক ব্যবস্থার আওতায় এই ধরনের সন্ত্রাসবাদী সংস্থা গুলিকে নথিভূক্ত করতে হবে। এছাড়া সন্ত্রাসবাদ এবং আন্তর্জাতিক সংগঠিত অপরাধের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক অনুধাবন করে এর সমাধানের রাস্তা খুঁজতে হবে। ভারতের অভিজ্ঞতা হল, ১৯৯৩’এর মুম্বাই বোমা বিস্ফোরণের জন্য যে অপরাধগোষ্ঠী জড়িত’, একটি বিশেষ দেশ তাকে কেবলমাত্র সংরক্ষণই দেয়নি, তাদের ফাইভ স্টার আতিথিয়তাও দিয়েছে।
সন্ত্রাসবাদে অর্থ সাহায্যের উৎসগুলি চিহ্নিত কোরে তার বিরুদ্ধে যথাযোগ্য ব্যবস্থা নিতে আর্থিক ব্যবস্থা গ্রহণ সংক্রান্ত টাস্কফোর্স বা এফএটিএফ’কে কালো টাকার ব্যবসা শক্ত হাতে দমন করতে হবে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাষ্ট্রসংঘের বাজেট থেকে এই বিশ্ব সংস্থার সন্ত্রাস দমন সংস্থাগুলির জন্য পর্যাপ্ত অর্থ সংস্থানের আহ্বান জানালেন। (মূল রচনাঃ- কৌশিক রায়)